প্রতিরক্ষা খাতে বছরে প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ আধুনিক সামরিক সরঞ্জামও রয়েছে দেশটির হাতে। তারপরও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ।
সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিপুল সামরিক ব্যয় ও উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন সব হামলা ঠেকানো যাচ্ছে না, তা নিয়ে সামনে এসেছে একাধিক কারণ।
প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল ব্যয়, তবু ঝুঁকিতে সৌদি আরব
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ৮৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এ ব্যয়ের ভিত্তিতে দেশটি বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করেছে সৌদি আরব।
তবে সামরিক শক্তি ও অস্ত্রের পরিমাণ থাকলেই একটি দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয় না। বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পাইপলাইন, সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে একই সঙ্গে সুরক্ষা দিতে হচ্ছে দেশটিকে।
এসআইপিআরআইয়ের সামরিক ব্যয়ের তথ্য: https://www.sipri.org/publications/2026/sipri-fact-sheets/trends-world-military-expenditure-2025
তিন দিক থেকে আসছে হুমকি
সৌদি আরবের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের বড় কারণ হলো একাধিক দিক থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকি। পূর্ব দিক থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, উত্তর দিক থেকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন এবং দক্ষিণ দিক থেকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থান নিয়ে হুতিরা মোবাইল লঞ্চার ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। ফলে হামলার উৎস শনাক্ত করা এবং উৎক্ষেপণের আগেই সেগুলো ধ্বংস করা সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সম্মিলিত কৌশল
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে হুতিরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করছে। এ ধরনের সম্মিলিত আক্রমণে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের লক্ষ্য শনাক্ত ও প্রতিহত করতে হয়।
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়তে পারে। ফলে রাডারে সেগুলো শনাক্ত করা এবং গতিপথ অনুসরণ করা কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, হুতিরা তাদের নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তন করার সক্ষমতার দাবিও করেছে।
একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যায়। ফলে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ধ্বংস করা সম্ভব হলেও প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করার নিশ্চয়তা থাকে না।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ও সামরিক প্রযুক্তির প্রশ্ন
ইরানের সঙ্গে হুতিদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেল অতীতে ইয়েমেনে ইরানি উৎসের সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন-সম্পর্কিত উপকরণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। হুতিদের ব্যবহৃত সাম্প্রতিক কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে ইরানি অস্ত্রের মিল রয়েছে বলেও বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।
এ ধরনের প্রযুক্তি ও সামরিক সহায়তা হুতিদের আক্রমণ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়িয়ে থাকতে পারে। তবে তাদের সামরিক শক্তি কেবল বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়; দীর্ঘদিনের সংঘাত থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় ভূখণ্ড সম্পর্কে জ্ঞানও তাদের কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।
সব স্থাপনা রক্ষা করতে গিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত
সৌদি আরবকে শুধু রাজধানী রিয়াদ বা একটি তেল শোধনাগার রক্ষা করলেই চলবে না। দেশটির জ্বালানি সরবরাহ, বিমান চলাচল, পানির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন।
তাই কোথায় কতটা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করা হবে, কোন হামলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং কোথায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত রাখা হবে—এসব বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষকে।
বিশেষ করে আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত হয়ে পড়লে প্রতিরক্ষা আরও জটিল হয়। প্রতিটি হামলার জবাবে ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যয় ও সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বাড়ছে উদ্বেগ
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটি পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অন্যান্য খাতে অর্থনীতি সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। এ পরিকল্পনার জন্য নিরাপদ বিমানবন্দর, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, তথ্যকেন্দ্র এবং পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এসব অবকাঠামো হামলার ঝুঁকিতে পড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগেও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
আবার হুতিদের বিরুদ্ধে আরও ব্যাপক বিমান হামলা চালালে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়তে পারে। ফলে সামরিকভাবে কঠোর জবাব দেওয়া এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা রিয়াদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কতটা কার্যকর হবে?
হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সহযোগিতা চাইছে। প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা এবং সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণ করা এ প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব সামরিক মজুত ও অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান পরিচালনা করাও সহজ নয়। ইয়েমেনের পার্বত্য ভূখণ্ডে গোষ্ঠীটির দীর্ঘদিনের অবস্থান, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে জটিল করে তুলেছে।
১৪ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, সৌদি আরামকোর সদর দপ্তরে হামলার পর দেশটির বিমানবন্দর ও তেল অবকাঠামোয় আরও হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুতিরা। এতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সামরিক শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন কূটনীতি
বিশাল সামরিক বাজেট, উন্নত অস্ত্র ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, সাশ্রয়ী ড্রোন ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত হামলা আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্যও বড় পরীক্ষা।
শুধু আরও অস্ত্র কেনা নয়, উন্নত গোয়েন্দা তথ্য, দ্রুত হামলা শনাক্তকরণ, বিভিন্ন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করাও প্রয়োজন। পাশাপাশি সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা ঠেকিয়ে জননিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা।
