সাধারণ কোনো সংক্রমণও কখনো প্রাণঘাতী সেপসিসে রূপ নিতে পারে। সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া দেখালে শরীরের নিজস্ব টিস্যু ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু না করলে সেপসিস থেকে একাধিক অঙ্গ বিকল, সেপটিক শক এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

সেপসিস একটি জরুরি চিকিৎসাগত অবস্থা। তাই সংক্রমণের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, রক্তচাপ কমে যাওয়া কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।

সেপসিস কী এবং কেন হয়?

সেপসিসকে অনেকে রক্তদূষণ বলে থাকেন। তবে এটি শুধু রক্তে জীবাণু প্রবেশ করার বিষয় নয়; বরং সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় অঙ্গের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার একটি গুরুতর অবস্থা। রক্তের কালচার পরীক্ষায় জীবাণু শনাক্ত না হলেও সেপসিস হতে পারে।

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাকসহ বিভিন্ন জীবাণুর সংক্রমণ থেকে সেপসিস হতে পারে। সাধারণত ফুসফুস, মূত্রনালি, ত্বক বা পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণ থেকে এর সূত্রপাত হয়।

সেপসিসের সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া, কিডনি বা মূত্রনালির সংক্রমণ, পেটের ভেতরের সংক্রমণ, সংক্রমিত ক্ষত, মেনিনজাইটিস এবং অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্যাথেটার-সম্পর্কিত সংক্রমণ।

সেপসিসের লক্ষণ কী কী?

সেপসিসের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। সংক্রমণের ধরন ও রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো হলো—

  • জ্বর, কাঁপুনি অথবা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া।
  • হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া বা নাড়ি দুর্বল হয়ে যাওয়া।
  • দ্রুত শ্বাস নেওয়া কিংবা শ্বাসকষ্ট।
  • অস্বাভাবিক দুর্বলতা, তীব্র শরীরব্যথা বা প্রচণ্ড অস্বস্তি।
  • বিভ্রান্তি, কথাবার্তা অসংলগ্ন হওয়া বা চেতনা কমে যাওয়া।
  • ত্বক ঠান্ডা, ঘামযুক্ত, ফ্যাকাশে বা ছোপছোপ হয়ে যাওয়া।
  • প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া।
  • রক্তচাপ কমে যাওয়া।

মনে রাখতে হবে, সব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয়। সংক্রমণের সঙ্গে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকলে সেপসিসের আশঙ্কায় জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

কোন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?

সেপসিসের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।

মস্তিষ্ক: রোগী বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন, অসংলগ্ন কথা বলতে পারেন কিংবা চেতনা হারাতে পারেন।

কিডনি: প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং গুরুতর অবস্থায় কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে।

ফুসফুস: শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে।

হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তসঞ্চালন: রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছানো ব্যাহত হতে পারে।

লিভার ও রক্ত জমাট বাঁধার ব্যবস্থা: গুরুতর অবস্থায় লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সেপসিসের সবচেয়ে বিপজ্জনক জটিলতাগুলোর একটি হলো সেপটিক শক। এ অবস্থায় রক্তচাপ ও রক্তসঞ্চালন বজায় রাখতে জরুরি চিকিৎসা, শিরায় তরল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ বাড়ানোর ওষুধ দিতে হয়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

যেকোনো বয়সের মানুষের সেপসিস হতে পারে। তবে কিছু মানুষের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যেমন—

  • বয়স্ক ব্যক্তি ও নবজাতক।
  • অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং সম্প্রতি সন্তান জন্ম দিয়েছেন এমন নারী।
  • ডায়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।
  • ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম।
  • হাসপাতালে ভর্তি বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রোগী।

এসব ব্যক্তির সংক্রমণ হলে লক্ষণ ও শারীরিক অবস্থার অবনতি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। <

সেপসিসের চিকিৎসা কী?

সেপসিসের চিকিৎসা হাসপাতালে দ্রুত শুরু করা জরুরি। রোগীর অবস্থা ও সংক্রমণের উৎস অনুযায়ী চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করেন।

১. অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ: ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ সন্দেহ হলে দ্রুত উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হতে পারে। জীবাণু ও পরীক্ষার ফল অনুযায়ী পরে ওষুধ পরিবর্তন করা হয়। সংক্রমণ ভাইরাস বা ছত্রাকের কারণে হলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

২. শিরায় তরল প্রদান: রক্তচাপ কমে গেলে এবং রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হলে রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে শিরায় তরল দেওয়া হয়।

৩. অক্সিজেন ও অঙ্গের সহায়তা: অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে অক্সিজেন বা প্রয়োজন অনুযায়ী শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তা দেওয়া হয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ ওষুধও লাগতে পারে।

৪. সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ: শরীরে পুঁজ জমে থাকলে তা নিষ্কাশন, সংক্রমিত ক্যাথেটার অপসারণ বা প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে।

৫. নিবিড় পর্যবেক্ষণ: রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, অক্সিজেনের মাত্রা এবং কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের কার্যক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।

সেপসিসের চিকিৎসা রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা বা ওষুধ পরিবর্তন করা উচিত নয়।

সেপসিস প্রতিরোধে কী করবেন?

সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে সেপসিসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

  • খাবারের আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পরে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
  • কাটা-ছেঁড়া বা ক্ষতস্থান পরিষ্কার রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার ব্যান্ডেজ ব্যবহার করতে হবে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নিতে হবে।
  • ডায়াবেটিস ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
  • চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না।
  • জ্বর, কাঁপুনি, শ্বাসকষ্ট বা সংক্রমণের সঙ্গে দ্রুত শারীরিক অবনতি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা: সেপসিসে সময়মতো চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে। সংক্রমণের সঙ্গে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হলে ঘরে বসে অপেক্ষা না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।

লেখার মূল উৎস: ডা. খাজা নাজিমুদ্দিনের স্বাস্থ্যবিষয়ক নিবন্ধ।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version