সম্পত্তি দান করার পরও দাতা বাবা-মা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন—এমন বিধান রেখে ‘১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। আইনটির উদ্দেশ্য, সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়া প্রবীণ বাবা-মায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, নতুন আইনের কারণে কেউ তাঁর নিজ ধর্মের আইন ও বিধান অনুসারে চলতে চাইলে কোনো বাধার মুখে পড়বেন না। মুসলিমদের প্রচলিত হেবা এবং অন্যান্য ধর্মের ব্যক্তিগত আইনও এই আইনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, সমাজে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে, যেখানে বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর তাঁদেরই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি ঠেকাতেই নতুন বিধান আনা হয়েছে।
কেন এই আইন
আসাদুজ্জামান বলেন, সম্পত্তি সন্তানদের দিয়ে দেওয়ার পর অনেক বাবা-মা শেষ বয়সে অসহায় হয়ে পড়ছেন। কারও সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি তা ভোগ করতে পারছেন না। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাবা-মায়ের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আইনটি করা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রচলিত পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনে বাবা-মাকে সন্তানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে হয়। সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতায় অনেক বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। ফলে তাঁদের সুরক্ষার জন্য সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেই ভোগাধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সম্পত্তির মালিক কে থাকবেন
আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, কোনো বাবা তাঁর বাড়ি বা অন্য সম্পত্তি সন্তানকে দান করলে দান সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সন্তানের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে নতুন বিধানের আওতায় বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার রাখবেন।
অর্থাৎ সম্পত্তির মালিকানা থাকবে গ্রহীতার কাছে, কিন্তু দাতা বাবা-মায়ের জীবনকালীন ভোগাধিকার বজায় থাকবে।
তিনি বলেন, দাতা ওই সম্পত্তি নিজের মতো করে বিক্রি, বন্ধক বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন না; তাঁর অধিকার হবে মূলত সম্পত্তি ভোগ করা।
ভোগাধিকার না দিলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ
সন্তান যদি দাতা বাবা-মাকে সম্পত্তি ভোগ করতে না দেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জেলা জজের কাছে সরাসরি আবেদন করতে পারবেন। আইনমন্ত্রী অবশ্য মনে করেন, আইনটি স্পষ্ট হওয়ায় এ ধরনের বিরোধ তুলনামূলকভাবে কম হবে।
তাঁর মতে, সম্পত্তির মালিকানা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকায় মালিকানা নিয়ে বিরোধ ও মামলা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
হেবা ও ধর্মীয় আইনে প্রভাব পড়বে না
নতুন আইন নিয়ে বিরোধী দল ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের আপত্তির প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রচলিত হেবা বা ধর্মীয় বিধানের ওপর এই আইন কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
তিনি বলেন, আইনের ১২২(এ)-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। মুসলিমদের হেবা ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের ব্যক্তিগত আইন বা সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রচলিত পদ্ধতিগুলোও এই আইনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বসবাস করেন। তাই আইনটি সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্মীয় আইন অনুসরণের সুযোগ পাবেন।
বিরোধিতার বিষয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য
বিরোধী দল ও কিছু ধর্মীয় সংগঠন বিলটিকে ইসলামবিরোধী বলে যে সমালোচনা করেছে, তা নাকচ করেছেন আইনমন্ত্রী। তাঁর দাবি, হেবা ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি এবং মুসলিম পারিবারিক আইনও এই আইনের মাধ্যমে বাতিল বা সীমিত করা হচ্ছে না।
তিনি জানান, এ বিষয়ে কয়েকজন ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনজীবী শিশির মনিরও ব্যক্তিগতভাবে এই আইনে কোনো ভুল দেখেননি বলে তাঁকে জানিয়েছেন।
কীভাবে সম্পত্তি দান করতে হবে
আইনমন্ত্রী জানান, নতুন বিধানের আওতায় সম্পত্তি দান করতে হলে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে তা করতে হবে, যেমনভাবে প্রচলিত দানের ক্ষেত্রে করা হয়। ইংরেজিতে এটিকে ‘গিফট’ বলা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ও মামলা বাড়ার পরিবর্তে কমার সম্ভাবনাই বেশি। বাস্তবে আইন প্রয়োগের পর কোনো সমস্যা দেখা দিলে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন বা সংযোজনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
তিনি বিরোধী দল ও ইসলামি স্কলারদের আইনটি ভালোভাবে পড়ে এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো বুঝে মতামত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
