দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা করছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। ডিসেম্বর মাসকে লক্ষ্য করে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী শ্রমিক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকর্মী ও কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষে একটি পক্ষের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যসংবলিত একটি প্রতিবেদন সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, সাধারণ শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যক্তি কারখানা ভাঙচুর, সহিংসতা ও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা এবং নেপথ্যে অর্থায়নের অভিযোগও রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা
গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে শিল্পাঞ্চলের মেট্রোরেল স্টেশন, ব্যাংক, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় হামলা বা অগ্নিসংযোগের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে মিরপুর, গাজীপুর ও আশুলিয়া এলাকার শিল্পকারখানা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
শ্রমিক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার অভিযোগ
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। তবে সাধারণ শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, কারখানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে।
তাসলিমা আখতার আরও বলেন, দ্রুত মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ করলে সুযোগ নিতে পারে আন্দোলনবিরোধী বিভিন্ন পক্ষ।
আন্দোলনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, বর্তমান আন্দোলনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। অনেক শ্রমিক কাজে যোগ দিতে চাইলেও তাঁদের বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং আন্দোলনে অংশ নিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
তাঁর মতে, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিকভাবে তুলে ধরলে তাতে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সহিংসতা ও ভাঙচুরের কারণে শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকেরাই ক্ষতির মুখে পড়বেন।
মালিকপক্ষের বক্তব্য
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন অব্যাহত থাকার পেছনে একটি গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তাঁর অভিযোগ, দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পোশাকশিল্পকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাধারণ শ্রমিকেরা কারখানা ভাঙচুরের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারেন না। এ ধরনের ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তা খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতায় একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণের প্রশ্ন, অন্যদিকে শিল্পকারখানার নিরাপত্তা ও উৎপাদন সচল রাখার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের দাবি পূরণের পাশাপাশি সহিংসতা ও উসকানির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

