বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাসজনিত রোগকে অবহেলা করলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী, অপুষ্টিতে ভোগা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
শিশুর জন্মগত হৃদ্রোগ থাকলে হামের সংক্রমণ আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়া, প্রাথমিক লক্ষণ চেনা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
হাম কতটা সংক্রামক?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি ও শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত কণার মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে টিকা না নেওয়া বা পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া ব্যক্তিদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে পানি পড়া। মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগও দেখা দিতে পারে, যা কপলিক স্পট নামে পরিচিত। সাধারণত কয়েক দিন পর মুখ ও মাথা থেকে শুরু হয়ে শরীরের অন্যান্য অংশে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হামের কারণে কী কী জটিলতা হতে পারে?
হাম শুধু জ্বর ও ফুসকুড়ির রোগ নয়। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে—
-
নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট
-
ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা
-
কানের সংক্রমণ
-
মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস
-
চোখের গুরুতর সমস্যা
-
দীর্ঘ সময় ধরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল থাকা
বিশেষ করে অল্পবয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল এমন শিশুদের ক্ষেত্রে এসব জটিলতার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
জন্মগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত শিশুদের বাড়তি সতর্কতা কেন?
শিশু হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ারের মতে, জন্মগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত সব শিশুর ঝুঁকি এক রকম নয়। হৃদ্রোগের ধরন ও তীব্রতা, হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা, ফুসফুসের অবস্থা এবং শিশুর পুষ্টির ওপর সংক্রমণের জটিলতা নির্ভর করে।
বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন এমন শিশুদের ক্ষেত্রে, যাদের জন্মগত হৃদ্রোগের সমস্যা সম্পূর্ণ সংশোধন হয়নি, হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কম অথবা ফুসফুসে রক্তপ্রবাহের অস্বাভাবিকতা রয়েছে। অপুষ্টিতে ভোগা ও বারবার গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদেরও বাড়তি যত্ন প্রয়োজন।
হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে আগে থেকেই হৃদ্যন্ত্র বা ফুসফুসের সমস্যায় ভোগা শিশুর শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে এবং শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। জ্বর ও সংক্রমণের সময় শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায়। এ ছাড়া পানিশূন্যতা ও শরীরের লবণের ভারসাম্য নষ্ট হলে শিশুর অবস্থা আরও জটিল হতে পারে।
তাই হৃদ্রোগে আক্রান্ত শিশুর জ্বর, কাশি বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হামের ঝুঁকি কমাতে টিকা জরুরি
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী শিশুকে হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা দিতে হবে।
শিশুর কোনো ডোজ বাদ পড়লে অথবা টিকা নেওয়া হয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক বা নিকটস্থ টিকাদানকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। হামে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার পর কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে শিশুর বয়স, টিকাদানের ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে কী ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
সংক্রমণ থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখবেন যেভাবে
পরিবারের কারও হাম সন্দেহ হলে শিশুকে তাঁর সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে হবে। বিশেষ করে জন্মগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
শিশুর জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হাম সন্দেহ হলে হাসপাতালে যাওয়ার আগে ফোন করে জানালে অন্য রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা, পানি পান করতে না পারা বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ বা উচ্চমাত্রার ভিটামিন এ দেওয়া উচিত নয়।
পাশাপাশি শিশুর বয়স অনুযায়ী সুষম খাবার নিশ্চিত করা এবং জন্মগত হৃদ্রোগ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপ চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতাই পারে গুরুতর জটিলতা কমাতে
হাম প্রতিরোধে নির্ধারিত সময়ে টিকাদান, সংক্রমণের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে জন্মগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারের সচেতনতা ও চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অভিভাবকদের উচিত টিকাদানের সময়সূচি মেনে চলা এবং অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
লেখক: অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগ।

