লক্ষ্মীপুরে টানা দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় একদিকে বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সংকটের সুযোগে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বেড়েছে ভাড়া। যাত্রীদের অভিযোগ, কিছু রুটে আগের তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও দিনের নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার অতিরিক্ত এলপিজি সিলিন্ডার মজুত করে রাখছে। নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার সিলিন্ডারের বাড়তি খরচ বহন করতে না পেরে মাটির চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে।

লক্ষ্মীপুরে গ্যাস সংকটে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

গত দুই সপ্তাহ ধরে লক্ষ্মীপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। কোথাও সকালে গ্যাস পাওয়া গেলেও দুপুর ও বিকেলে তা থাকে না। আবার কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে রান্না করা সম্ভব হয় না।

বাসাবাড়িতে রান্নাবান্নায় চরম ভোগান্তি

শহরের সমসেরাবাদ, লামচরী, শাঁখারীপাড়া, লইয়ার্স কলোনি, মদিন উল্যাহ হাউজিং, মোবারক কলোনি, শিল্পী কলোনি, বাগবাড়ী, বাঞ্চানগর ও মজুপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকটের প্রভাব দেখা গেছে।

গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক গৃহিণীকে খুব ভোরে উঠে রান্নাবান্নার কাজ শেষ করতে হচ্ছে। দিনের পরবর্তী সময়ে গ্যাস না থাকায় খাবার গরম করাও সম্ভব হচ্ছে না। এতে পরিবারের সদস্যদের ঠান্ডা খাবার খেতে হচ্ছে।

এলপিজি ও মাটির চুলার ওপর নির্ভরতা

দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনছে। তবে অতিরিক্ত খরচের কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর অনেকেই মাটির চুলা তৈরি করে রান্না করছেন। ফলে বাড়ছে সংসারের অতিরিক্ত ব্যয়।

নোয়াখালীতে পাইপলাইন লিকেজেও বিপাকে লক্ষ্মীপুর

নোয়াখালীর কেন্দুরবাগ এলাকায় গ্যাস পাইপলাইনে লিকেজের কারণে লক্ষ্মীপুরে টানা দুই দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে অনেক বাসাবাড়িতে রান্না হয়নি। বাধ্য হয়ে অনেকে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেয়েছেন।

কেউ কেউ আবার এক থেকে দুই বেলা শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। পাইপলাইনের লিকেজ মেরামতের পর রোববার মধ্যরাত থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এরপরও দিনের বড় একটি সময় গ্যাসের চাপ থাকে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ

মজুপুর এলাকার বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটের কারণে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। কয়েকদিন হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হয়েছে। অতিরিক্ত খরচের কারণে গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্যও হয়নি।

শাখারিপাড়া এলাকার গৃহিণী মিথিকা সাহা বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় সময়মতো রান্না করা সম্ভব হয় না। বাড়িতে মেহমান এলে তাদের আপ্যায়নের জন্য হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

লামচরী এলাকার বাসিন্দা সাথী আক্তার ও মিলন আক্তার জানান, ফজরের আজানের পর থেকেই রান্নার কাজ শুরু করতে হয়। দুপুরে গ্যাস না থাকায় রান্না করা খাবার গরম করার সুযোগও থাকে না। ফলে অনেক সময় ঠান্ডা খাবার খেতে হয়।

তারা আরও জানান, লাইনের গ্যাসের কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় বাড়িতে অতিরিক্ত সিলিন্ডার গ্যাসও রাখতে হচ্ছে।

গ্যাস সংকটে সিএনজির ভাড়া বেড়েছে কয়েক গুণ

গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলেও। চালকদের দাবি, গ্যাস নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

৫ টাকার ভাড়া এখন ১৫ টাকা

দালাল বাজার এলাকার বাসিন্দা মাসুদ আলম বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। ৫ টাকার ভাড়া এখন ১৫ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। আবার ২০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা পর্যন্ত।

মান্দারী এলাকার বাসিন্দা বায়েজিদ হোসেন বলেন, ১০ টাকার ভাড়া এখন ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। সুযোগ বুঝে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভাড়া কমানোর বিষয়টি খুব একটা দেখা যায় না।

চালকদের দাবি, গ্যাস সংকটেই বেড়েছে ভাড়া

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রুবেল হোসেন ও জামাল উদ্দিন বলেন, গ্যাস নিতে অনেক সময় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এতে দিনের বড় একটি অংশ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে যায়। তারপরও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

সড়কের খারাপ অবস্থার কথাও বলছেন চালকরা

চালকদের দাবি, গ্যাস সংকটের পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের অবস্থাও খারাপ। লক্ষ্মীপুর থেকে জকসিন, মান্দারী, বটতলি, হাজিরপাড়া ও চন্দ্রগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় চলাচলের পর আবার ফিরে আসতে গিয়ে গাড়ির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। অনেক সময় গাড়ি বিকল হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

চালকদের ভাষ্য, এসব বিষয় বিবেচনা করেই বর্তমানে বেশি ভাড়া নিতে হচ্ছে।

গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বাখরাবাদ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির লক্ষ্মীপুরের সহকারী প্রকৌশলী খোরশেদ আলম বলেন, গ্যাস সংকট শুধু লক্ষ্মীপুরে নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকাতেই ছিল।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম

তিনি জানান, লক্ষ্মীপুরে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু গত কয়েকদিনে সরবরাহ এসেছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ হাজার ঘনফুট।

এর মধ্যে নোয়াখালীর কেন্দুরবাগ এলাকায় পাইপলাইনে লিকেজের কারণে দুই দিন গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে বলে তিনি জানান।

দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস

খোরশেদ আলম বলেন, খুব শিগগিরই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। তবে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ ও পরিবহন চালকদের দুর্ভোগ যে বেড়েছে, তা স্পষ্ট।

গ্যাস সংকটে বাড়ছে মানুষের অতিরিক্ত খরচ

লক্ষ্মীপুরের বর্তমান গ্যাস সংকটে একই সঙ্গে বাড়ছে বাসাবাড়ির রান্নার খরচ এবং যাতায়াত ব্যয়। একদিকে অনেক পরিবারকে এলপিজি সিলিন্ডার বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি সিএনজি ভাড়ার কারণে যাত্রীদেরও অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।

দ্রুত ও স্থায়ীভাবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version