রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে কক্সবাজারের শিবির ও সমুদ্রপথে মানবপাচারের ঝুঁকিও বাড়ছে। এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ১০টি বিষয়ে তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়েছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের মানবপাচারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক সিওভান মুলালি, অভিবাসীদের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক গেহাদ মাদি এবং নারী ও মেয়েদের প্রতি বৈষম্যবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ারম্যান-র্যাপোর্টিয়ার ক্লডিয়া ফ্লোরেসের পাঠানো যোগাযোগ নথিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। নথিটি গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়।
কক্সবাজারে ৪০৭ মানবপাচারের ঘটনা
জাতিসংঘের নথিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ৪০৭টি মানবপাচারের ঘটনা শনাক্ত করা হয়। এসব ঘটনায় পুরুষ, নারী ও শিশুরাও ভুক্তভোগী ছিলেন।
পুরুষ ও ছেলেদের ক্ষেত্রে কৃষি, পশুপালন, মাছ ধরা, বনকাজ ও নির্মাণশ্রমে পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। আর নারী ও মেয়েদের ক্ষেত্রে কারখানার কাজ, গৃহস্থালি শ্রম ও জোরপূর্বক যৌন শোষণের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাকরি, শিক্ষা ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েও শরণার্থীদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা বাড়ছে
রোহিঙ্গাদের অনিরাপদ সমুদ্রযাত্রা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। নথিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হন। তাদের মধ্যে ৮৯০ জনের বেশি নিহত বা নিখোঁজ হন।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৪৯ জন সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি।
৯ এপ্রিলের নৌকাডুবি নিয়েও প্রশ্ন
জাতিসংঘের নথিতে গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে একটি নৌযানডুবির ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রায় ২৫০ জন নিহত বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, নৌযানটি ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। প্রবল বাতাস, উত্তাল সমুদ্র ও অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নৌযানটি ডুবে যায় বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ কয়েকজনকে উদ্ধার করে এবং তাদের বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ নিয়ে উদ্বেগ
সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দেশে ফেরত আনার পর কখনো কখনো আটক বা গ্রেপ্তার করার অভিযোগও জাতিসংঘের নথিতে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে তারা প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার বদলে অনিয়মিত অভিবাসী বা অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।
তারা জানতে চেয়েছেন, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কীভাবে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয় এবং মানবপাচারের সম্ভাব্য ভুক্তভোগী হিসেবে তাদের কীভাবে যাচাই করা হয়।
বাংলাদেশের কাছে ১০ বিষয়ে ব্যাখ্যা
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা নৌকাডুবির তদন্ত, সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষা, মানবপাচারের ঝুঁকি শনাক্তকরণ, রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, পাচারসংক্রান্ত তদন্ত ও বিচার এবং ভুক্তভোগীদের আইনি, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিয়ে জানতে চেয়েছেন।
এ ছাড়া দারিদ্র্য, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, জীবিকার সংকট, পরিচয়পত্রের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগের অভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
তবে জাতিসংঘের নথিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের কাছে পাওয়া তথ্য ও অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে তারা আগাম কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে রোহিঙ্গাদের অনিরাপদ সমুদ্রযাত্রা, মানবপাচারের ঝুঁকি, ভুক্তভোগীদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
