রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ৮ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য এখনো নির্ধারিত হয়নি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে ব্যয় হিসাব এবং বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিডিবির বিশেষজ্ঞ কমিটি রূপপুরের বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ৭ মার্কিন সেন্ট বা ৮ টাকা ৭৫ পয়সা হতে পারে বলে হিসাব করেছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের দাবি, বিমা ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে প্রতি ইউনিটের দাম ১০ টাকার কম হবে না।
প্রতি ইউনিটের দাম নিয়ে দুই ধরনের হিসাব
পিডিবির বিশেষজ্ঞ কমিটি রূপপুরের বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট ৭ মার্কিন সেন্টে পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে। এ হিসাবের ভিত্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল ৬০ বছর ধরে মূল্যায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটম কেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল ৮০ বছর ধরার সুপারিশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিডিবির হিসাবে কেন্দ্রটির বিনিয়োগ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বলছে, এ হিসাবের মধ্যে কিছু ব্যয় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশেষ করে বিমা ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম আরও বাড়তে পারে।
এ নিয়ে পিডিবি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি বা পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ) সই হওয়ার পর মূল্যসংক্রান্ত বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
ঋণ পরিশোধে ২০ বছরে ব্যয় হবে ২০ বিলিয়ন ডলার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রূপপুর প্রকল্পে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ব্যয় ধরা হলেও ৪ শতাংশ সুদসহ ঋণ পরিশোধে ২০ বছরে সরকারকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে।
কেন্দ্রটির প্রতিটি ইউনিট থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব করা হয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহারের হার ধরা হয়েছে ৯০ শতাংশ। এ ছাড়া কেন্দ্রটির বার্ষিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ২০ কোটি ডলার হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট হিসাবের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।
পিডিবির বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রকল্পটির জন্য আলাদা ক্যাপাসিটি চার্জ না দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জ হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার জন্য নির্দিষ্ট শর্তে দেওয়া অর্থ, যা প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণের সঙ্গে সরাসরি এক নয়।
ঋণ পরিশোধের পর কমতে পারে বিদ্যুতের দাম
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ধারণা, ঋণ পরিশোধের ২০ বছর পর রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩ মার্কিন সেন্টে নেমে আসতে পারে। তবে এ হিসাব নির্ভর করবে প্রকল্পের পরিচালন ব্যয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য খরচের ওপর।
ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ২ দশমিক ৫০ থেকে ৪ দশমিক ৫০ রুপি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তুলনায় বাংলাদেশের রূপপুর কেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের সম্ভাব্য ব্যয় ৮ থেকে ১০ টাকা ধরা হচ্ছে। তবে দুই দেশের ব্যয়ের হিসাবের ভিত্তি ও আর্থিক কাঠামো এক কি না, তা বিবেচনায় রেখেই এ তুলনা করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হার বাড়লে বিদেশি ঋণ, আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক ব্যয়ের কারণে প্রকল্পের মোট খরচেও প্রভাব পড়তে পারে।
রূপপুরে পৌঁছেছে পারমাণবিক জ্বালানির আরেকটি চালান
এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য আরও এক চালান পারমাণবিক জ্বালানি এসেছে। মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় জ্বালানি বহনকারী গাড়িগুলো প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে।
এর আগে সোমবার সকালে রাশিয়া থেকে আসা একটি বিমানে জ্বালানি ভারতের দিল্লি হয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বিমানটিতে ১২টি টিপিএসে মোট ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি আনা হয়। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা জ্বালানি বুঝে নেন।
রূপপুরের বিদ্যুতের চূড়ান্ত দাম নির্ভর করবে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়, ঋণ পরিশোধ, পরিচালন খরচ এবং পিডিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চুক্তির ওপর। তাই ৮ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১০ টাকা বা তার বেশি—এগুলোকে আপাতত সম্ভাব্য হিসাব হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।