নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও অর্থনীতি নিয়ে এখনই পুরোপুরি স্বস্তিতে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বাংলাদেশ পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম. মাসরুর রিয়াজ।
এক বিশ্লেষণে তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরে প্রবাসী আয় দ্বি-অঙ্কের হারে বাড়ছে। পাশাপাশি পণ্য রপ্তানিও ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের BPM-6 হিসাব অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওপরে উঠেছে। কয়েক বছর আগে রিজার্ভ দ্রুত কমে যাওয়ার পর এ অগ্রগতি ইতিবাচক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে সামনে কয়েকটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। মাসিক হিসাবে পণ্য রপ্তানি ১৩ শতাংশ বাড়লেও আগস্টে জুলাইয়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ভবিষ্যতে রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে রেমিট্যান্সেও ঝুঁকি
প্রবাসী আয়ও ভবিষ্যতে চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। কয়েক মাস আগেও মাসিক প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। বর্তমানে তা ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে নতুন কর্মীদের ওই অঞ্চলে যেতে না পারায় সামনে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অন্যদিকে, রিজার্ভ বাড়লেও উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য আমদানি বাড়লে আবারও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হবে। বর্তমানে প্রায় ৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে আমদানি তুলনামূলক কম রয়েছে। প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ৬ শতাংশে উন্নীত করতে আমদানি বাড়লে বর্তমান রিজার্ভ সেই চাপ দীর্ঘমেয়াদে সামলাতে পারবে না বলে মনে করেন মাসরুর রিয়াজ।
বাড়ছে LNG আমদানির ব্যয়
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামও বেড়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রতি MMBTU ১০ থেকে ১২ ডলারের LNG এখন ২৫ থেকে ২৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে।
এই দাম অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে সরকারের LNG কেনার ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। অথচ এ খাতে বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতিতেই আটকে আছে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি
বৈদেশিক খাতে উন্নতি হলেও এর সুফল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং দুর্বল বিনিয়োগ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকায় মানুষও তুলনামূলক কম খরচ করছে এবং সঞ্চয় ধরে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে মানুষের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে, যা অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
জ্বালানি সরবরাহে রপ্তানিমুখী শিল্পকে অগ্রাধিকার
মাসরুর রিয়াজের মতে, জ্বালানি সংকট পুরোপুরি সমাধানে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। তবে এর মধ্যবর্তী সময়ে জরুরি ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলো থেকে LNG সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
বাড়তি জ্বালানি আমদানির ব্যয় সামাল দিতে বিশ্বব্যাংক ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও ঋণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্প উৎপাদন সচল রাখা গেলে কর্মসংস্থানও বাড়বে বলে মনে করেন বাংলাদেশ পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান।
তার মতে, রিজার্ভ, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের কিছু ইতিবাচক সূচক অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা দিলেও জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
