নিজস্ব প্রতিবেদক,

রংপুর নগরীতে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ডাকাতির উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হলেও নিহতদের স্বজনদের দাবি, এর পেছনে বড় কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী পৃতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগমী চক্রবর্তী প্রার্থি (২৩) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)।

শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দাসপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, মরদেহগুলোর অবস্থান ছিল ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়িতে, বাবার মরদেহ বাড়ির ছাদে এবং ছেলের মরদেহ একটি খাটের নিচে পাওয়া যায়।

মুখ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ

রংপুর সিআইডির ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানিয়েছেন, চারটি মরদেহের মুখ রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার প্রধান ও উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার ভোরের মধ্যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে। প্রাথমিকভাবে তাঁদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুজন গ্রেপ্তার

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ মুগ্ধ দাস (২১) ও তাঁর চাচাতো ভাই সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করেছে। মুগ্ধ স্বর্ণকারের সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং সিদ্ধার্থ রংপুর সিটি বাজারে মাছের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। দুজনই দাসপাড়া এলাকায় থাকেন।

পুলিশ জানিয়েছে, দুজনই মাদকাসক্ত বলে তাদের দাবি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন থেকে গণপতি চক্রবর্তীর দুইতলা বাড়ির ছাদে উঠে ওই দুজন সেখানে ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ শুনে গণপতি ছাদে গেলে তাঁকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয় বলে দাবি পুলিশের।

পরে তাঁর স্ত্রী পৃতিলতা ছাদে গেলে তাঁকেও এবং তাঁদের মেয়ে প্রার্থিকেও সিঁড়িতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এরপর ঘরের ভেতর ছেলে প্রিয়মকে হত্যা করা হয়।

পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। হত্যার পর তাঁরা বাড়িতে গোসল করেন, খাবার খান এবং পরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যান বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এলাকার একটি পরিত্যক্ত ভবন থেকে পরিবারের কিছু স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

স্বজনদের সন্দেহ বড় চক্রের দিকে

নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রোববার রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার দুজনকে তিনি চেনেন না। তাঁর ধারণা, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও বড় কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানান তিনি।

নিহতদের স্বজন পূজা চক্রবর্তীও মনে করেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি শেষবার বোন পৃতিলিতার সঙ্গে কথা বলেন। এরপর থেকে পরিবারের চারটি ফোনই বন্ধ পাওয়া যায়।

শনিবার রাতে স্বজনেরা দাসপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখেন, প্রধান ফটকে তালা এবং ভেতরের সব আলো বন্ধ। পরে পুলিশ এসে তালা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

গণপতির এক আত্মীয় বিশ্বনাথ চক্রবর্তী জানান, বাড়ি নির্মাণের সময় কিছু লোক তাঁকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত করত। এ নিয়ে গণপতি তাঁকে জানিয়েছিলেন। তবে তিনি বিষয়টির বিস্তারিত কিছু বলেননি।

চার বছর ধরে বসবাস

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবার প্রায় চার বছর ধরে দাসপাড়া এলাকায় বসবাস করছিলেন। গত ৩১ ডিসেম্বর তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তাঁর মেয়ে প্রার্থি চলতি বছর রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ছেলে প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, গণপতি ও তাঁর পরিবার এলাকায় খুব বেশি মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতেন না। তবে প্রতিবেশীদের কাছে গণপতি ভদ্র ও বন্ধুসুলভ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

এ ঘটনায় রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছেন। বিভিন্ন সংগঠনও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়ে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version