ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিহারের রাজধানী পাটনায় একটি জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় এক ব্যক্তির মন্তব্যের জবাবে খাড়গে বলেন, ‘মোদির বাবাও যাবেন।’ তাঁর এই বক্তব্যের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংয়ের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পাটনায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) এ নিয়ে বিজেপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের খবর পাওয়া গেছে।
যেভাবে বিতর্কের সূত্রপাত
পাটনার বাপু সভাগারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় খাড়গে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে বিরোধী দলের সমর্থকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাঁদের জেলে পাঠানো হবে। এ সময় উপস্থিত এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতা থেকে সরে যাবেন না বলে মন্তব্য করেন।
এর জবাবে খাড়গে উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘মোদির বাবাও যাবেন।’ তাঁর এই মন্তব্যের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।
মন্তব্যের প্রতিবাদে বিজেপির বিক্ষোভ
খাড়গের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিজেপির শীর্ষ নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রয়াত বাবাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় খাড়গের ভাষার সমালোচনা করেন। বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীনসহ দলের অন্য নেতারাও কংগ্রেস সভাপতির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান।
বিজেপি জানিয়েছে, সোমবার দেশজুড়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। বিহারের পাটনায় বিজেপির নেতাকর্মীরা ‘জন আক্রোশ মার্চ’ বের করেন এবং খাড়গের প্রতিকৃতি পোড়ান।
বিজেপি নেতাদের দাবি, খাড়গের এই বক্তব্যের জন্য কংগ্রেস সভাপতির ক্ষমা চাওয়া উচিত। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যে মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
কী বলছেন ওই অনুষ্ঠানে মন্তব্য করা ব্যক্তি?
সভায় খাড়গের বক্তব্যের মধ্যে কথা বলা ব্যক্তির নাম সন্তোষ কুমার বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। পরে তিনি দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য পুরোপুরি শোনা হয়নি এবং তাঁকে ভুল বোঝা হয়েছে।
সন্তোষ কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে ব্যাপক প্রতিবাদ বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের উদ্যোগ ছাড়া নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতা থেকে সরানো সহজ হবে না। তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ শোনার পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে তিনি দাবি করেন।
ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে সভার ভেতরে ওই ব্যক্তিকে বের করে দেওয়া এবং তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
খাড়গের বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
পাটনার ওই অনুষ্ঠানে খাড়গে শুধু প্রধানমন্ত্রী মোদির সমালোচনা করেননি; তিনি বিজেপি, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও জানান।
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে আগে থেকেই রাজনৈতিক মতবিরোধ রয়েছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধী দলের সমর্থকদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্তের মূল্যায়নে নির্দিষ্ট তথ্য, নথি এবং আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেই খাড়গের মন্তব্য নতুন করে দুই দলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণের বিতর্ক
ভারতের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহারের ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচার ও রাজনৈতিক সভায় ব্যক্তিগত আক্রমণ, তীব্র বাক্যবিনিময় এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বারবার বিতর্ক তৈরি করেছে।
তবে নির্বাচনী অনিয়ম, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জনকল্যাণ ও শাসনব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিসরের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তিগত আক্রমণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হলে মূল নীতিগত প্রশ্নগুলো অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।
খাড়গের সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে বিজেপির প্রতিবাদ এবং কংগ্রেসের পাল্টা বক্তব্যও ভারতের চলমান রাজনৈতিক মেরুকরণের আরেকটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সামনে কী হতে পারে?
খাড়গের মন্তব্য ঘিরে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। বিজেপি দেশজুড়ে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে কংগ্রেস সভায় রাজনৈতিক বাধা সৃষ্টি এবং বিরোধীদের বক্তব্য থেকে মনোযোগ সরানোর অভিযোগ তুলেছে।
এখন বিতর্কটি রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়, তা দেখার বিষয়। একই সঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ নিয়ে আলোচনাও ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্ব পেতে পারে।
