রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনে অস্থিরতা সৃষ্টি ও নাশকতার অভিযোগ উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। পুলিশের দাবি, সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে প্রবেশ করে একটি পক্ষ সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের চেষ্টা করেছে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী সন্দেহে ২৮ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রোববার (১ নভেম্বর) মিরপুর-১০ ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিবি মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খাঁন জানান, কয়েক দিন ধরে পোশাকশ্রমিকেরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলন করছেন। তবে শনিবার থেকে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। রোববারও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
তাঁর দাবি, সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকতার চেষ্টা করছেন।
ডিবির এই কর্মকর্তা জানান, প্রথম পর্যায়ে মিরপুর-১০ ও আশপাশের এলাকা থেকে ১১ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী রয়েছেন বলে দাবি পুলিশের।
পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগ আরও ১৭ জনকে আটকের তথ্য জানায়। ফলে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট আটকের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮ জনে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ডিবি কর্মকর্তার অভিযোগ, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের মিরপুরে আনার পেছনে একজন সমন্বয়কের ভূমিকা রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও আটকের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে মিরপুরে আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে সরানোর পর ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে বলে পুলিশের সন্দেহ হয়েছে।
তিনি জানান, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বিষয়টি আন্দোলনকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তাঁরা সড়ক ছাড়তে রাজি হননি। পরে জনভোগান্তি কমাতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে তাঁদের সরিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজিবুল ইসলামের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া কয়েকটি পোস্ট ও ভিডিও নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। এসব পোস্টে তাঁকে শ্রমিক আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পোস্টের উদ্দেশ্য বা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকদের মূল দাবি ৩০ হাজার টাকা মজুরি
পোশাকশ্রমিকেরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন। রোববার সকাল ৮টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করেন। পরে আন্দোলন মিরপুর-১১, ১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল থেকে সড়ক অবরোধের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১১টার পর পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। সংঘর্ষের সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
এদিকে শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তবে বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
সব মিলিয়ে, মিরপুরের শ্রমিক আন্দোলনে একদিকে মজুরি বৃদ্ধির দাবি, অন্যদিকে সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের পক্ষ থেকে নাশকতার অভিযোগ আনা হলেও এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

