রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অপরাধে ‘মামুন বাহিনী’র নাম আসছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, বিদেশে অবস্থানকারী মফিজুর রহমান মামুনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই দলটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে।

পল্লবীর বাইগারটেক এলাকায় আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর প্রায় ২৮ কাঠা জমি দখলের অভিযোগও উঠেছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। মোহাম্মদ আলীর দাবি, গত ৩০ এপ্রিল রাতে বুলডোজার দিয়ে তাঁর জমির সীমানাপ্রাচীর ও ঘরগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য, জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। তিনি অভিযোগ করেছেন, মামুনের ভাই মশিউর রহমান তাঁকে ফোন করে জমিতে যেতে নিষেধ করেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরের অপরাধজগতে চারটি পৃথক গ্রুপ বা ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ সক্রিয় রয়েছে। এর একটি ‘মামুন বাহিনী’। অন্য তিনটি গ্রুপের সঙ্গে ইব্রাহিম ওরফে ‘কিলার ইব্রাহিম’, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহাদত হোসেন ও মোক্তার নামের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কথা সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, ইব্রাহিমের অনুসারীরা মিরপুর-১৩, মিরপুর-১৪, ভাষানটেক ও কালশী এলাকায়, শাহাদতের অনুসারীরা মিরপুর-১, মিরপুর-২ ও মিরপুর-৬ এলাকায় এবং মোক্তারের অনুসারীরা মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১-এর কিছু এলাকায় সক্রিয়।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মফিজুর রহমান মামুন বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকে পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় জমি দখল, চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর দুই ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমান দেশে থেকে দলটির কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গত মার্চের চাঁদাবাজির তালিকাতেও মামুন ও তাঁর দুই ভাইয়ের নাম থাকার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই তালিকায় মিরপুরের সাতটি থানার এলাকায় ৭২ জন চাঁদাবাজ ও ২৫ জন আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতার নাম ছিল।

মামুনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা থাকার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। ২০২১ সালে তিনি গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্ত হয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।

জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ

অনুসন্ধানে অন্তত সাতটি জমি দখলের ঘটনার সঙ্গে মামুন বাহিনীর নাম পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সাগুফতা হাউজিং এলাকায় ১৮টি পরিবারের জমি দখল এবং ঘর ভেঙে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া মিরপুরের পোশাক কারখানাগুলো থেকেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিভিন্ন কারখানা থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয় এবং ঝুট ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

পল্লবীর এ কে বিল্ডার্সের কার্যালয়ে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনাতেও মামুন বাহিনীর নাম আসে। পুলিশ জানিয়েছিল, ওই হামলায় চারটি গুলি করা হয়েছিল এবং একজন আহত হন।

যুবদল নেতা হত্যার মামলাতেও নাম

পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনকে মামুন বাহিনীর সদস্য বলে জানিয়েছিল পুলিশ। কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার অভিযোগ করেন, মামুনের ভাই মশিউর রহমান শুটার ভাড়া করে তাঁর স্বামীকে হত্যা করিয়েছেন। তবে এটি তাঁর অভিযোগ; মামলাটি এখনো তদন্তাধীন।

ডিবির মিরপুর বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

মিরপুরে সক্রিয় কিশোর গ্যাং

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মামুন বাহিনীর পাশাপাশি পল্লবী এলাকায় ‘ভইরা দে গ্রুপ’ ও ‘বাহুবলী গ্রুপ’সহ কয়েকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। ‘ভইরা দে গ্রুপ’-এর নেতা হিসেবে মো. আশিকের নাম এসেছে। চাঁদাবাজি নিয়ে আশিক ও মশিউর রহমানের বিরোধের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওসমান গণি জানিয়েছেন, মিরপুরের অপরাধ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। বিদেশে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে, মামুনের ভাই মশিউর রহমান চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, জমি নিয়ে বিরোধে বৈধ কাগজপত্র থাকলে তাঁরা সহযোগিতা করেন।

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধে জড়িত হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক বলেছেন, দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা জরুরি।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version