মানুষের জীবন কখনো সুখের, কখনো দুঃখের। কখনো নিজের অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা কিংবা বিপদ-আপদে মানুষ কষ্ট পায়। আবার কখনো অন্যের কথা, অবহেলা, অপমান কিংবা আচরণে হৃদয় ভেঙে যায়। এমন কিছু কষ্ট থাকে, যা কাউকে বলা যায় না; নীরবে চোখের পানি ফেলতে হয়।

কিন্তু একজন মুমিনের জন্য আশার বিষয় হলো, জীবনের কোনো কষ্টই আল্লাহর কাছে মূল্যহীন নয়। ধৈর্য ও ঈমানের সঙ্গে বিপদ-আপদ সহ্য করলে তা গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে। এমনকি শরীরে একটি কাঁটা বিঁধলেও এর বিনিময়ে আল্লাহ বান্দার কিছু গুনাহ ক্ষমা করে দেন।

তাহলে প্রশ্ন হলো, মানুষের কথা ও কাজে কষ্ট পেলেও কি গুনাহ মাফ হয়? এ বিষয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে কী বলা হয়েছে?

১. মানুষের আচরণে কষ্ট পেলেও গুনাহ মাফ হতে পারে

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) ও আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

‘কোনো মুসলিমের ওপর ক্লান্তি, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয় না, এমনকি তার শরীরে একটি কাঁটা বিঁধলেও এর বিনিময়ে আল্লাহ তার কিছু গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’

(সহিহ বুখারি: ৫৬৪১-৫৬৪২; সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণা, দুশ্চিন্তা ও মানুষের কাছ থেকে পাওয়া কষ্টও মুমিনের জন্য গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে।

অর্থাৎ কেউ আপনার সঙ্গে খারাপ আচরণ করল, অপমান করল কিংবা এমন কোনো কথা বলল, যাতে আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন—সেই কষ্ট ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করলে আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাওয়ার আশা রয়েছে।

তবে মনে রাখতে হবে, হাদিসে ‘কিছু গুনাহ’ ক্ষমার কথা বলা হয়েছে। তাই প্রত্যেক কষ্টেই সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়।

২. বিপদ-আপদ মুমিনের জন্য পরীক্ষা

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন,

‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা বিপদে পতিত হলে বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত। আর তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’

(সুরা আল-বাকারা: ১৫৫-১৫৭)

এই আয়াতগুলো আমাদের শেখায়, দুনিয়ার জীবন একটি পরীক্ষার জায়গা। জীবনে কষ্ট আসা মানেই আল্লাহ অসন্তুষ্ট—এমন নয়। বরং কখনো বিপদ-আপদের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করেন।

তাই বিপদের সময় হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

৩. কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তির সুসংবাদ

মানুষ যখন দীর্ঘদিন দুশ্চিন্তা, অপমান কিংবা মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়, তখন অনেক সময় মনে হয় এই কষ্টের বুঝি শেষ নেই। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন,

‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি।’

(সুরা আশ-শরহ: ৫-৬)

আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি মুমিনের জন্য বড় সান্ত্বনা। তাই জীবনের কঠিন সময়ে ধৈর্য হারানো উচিত নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে দোয়া করতে হবে এবং বৈধ উপায়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

৪. সুখ-দুঃখ সব অবস্থায় মুমিনের জন্য কল্যাণ রয়েছে

হজরত সুহাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

‘মুমিনের ব্যাপারটি বিস্ময়কর! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়। তার জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি এলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ-কষ্টে পতিত হলে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে সেটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’

(সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, একজন মুমিন সুখের সময়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং দুঃখের সময়ে ধৈর্য ধারণ করেন। এভাবেই তাঁর জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতি কল্যাণের উপলক্ষ হতে পারে।

৫. যারা অন্যকে কষ্ট দেয়, তাদের কি কোনো জবাবদিহি নেই?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। কেউ অন্যকে অপমান, গালিগালাজ, হয়রানি কিংবা অন্যায় আচরণের মাধ্যমে কষ্ট দিলে শুধু তার নিজের কষ্ট সহ্য করার কারণে সেই অন্যায় বৈধ হয়ে যায় না।

বরং অন্যের অধিকার নষ্ট করা ইসলামে গুরুতর অপরাধ।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমরা কি জানো প্রকৃত নিঃস্ব কে?

সাহাবিরা বললেন, আমাদের মধ্যে যার কোনো সম্পদ নেই, সেই নিঃস্ব। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যাখ্যা করলেন, কিয়ামতের দিন এমন ব্যক্তি নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে, কিন্তু সে দুনিয়ায় কাউকে গালিগালাজ করেছে, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করেছে কিংবা কাউকে আঘাত করেছে। ফলে তার নেকি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।

(সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)

অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করে শুধু ইবাদত করলেই দায়মুক্তি পাওয়া যাবে না। তাই কাউকে কষ্ট দিলে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা জরুরি।

একইভাবে কেউ আপনার সঙ্গে অন্যায় করলে ধৈর্য ধারণ করা সওয়াবের কাজ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না কিংবা নিজের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করা যাবে না।

৬. জীবনে কষ্ট এলে একজন মুমিনের করণীয়

জীবনে দুঃখ-কষ্ট কিংবা মানুষের খারাপ আচরণের শিকার হলে একজন মুমিনের উচিত—

ধৈর্য ধারণ করা: বিপদের সময় হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।

নামাজ ও দোয়া করা: মানসিক প্রশান্তি, বিপদ থেকে মুক্তি এবং কল্যাণের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।

বেশি বেশি ইস্তিগফার করা: নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

আল্লাহর রহমতের আশা রাখা: জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতেও কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া।

অন্যায়ের প্রতিবাদ করা: কেউ জুলুম করলে নিজের অধিকার রক্ষায় বৈধ ও নিরাপদ উপায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।

অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া: সবর করার পাশাপাশি রোগ ও সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানের চেষ্টা করা।

কষ্টের সময় আল্লাহর রহমতের আশা হারাবেন না

প্রিয় মুমিন ভাই ও বোনেরা, জীবনে যত কষ্টই আসুক, হতাশ হয়ে পড়বেন না। আপনার চোখের পানি, মনের যন্ত্রণা, অসুস্থতা ও দুশ্চিন্তার কথা আল্লাহ জানেন। মানুষের কাছে আপনার কষ্টের মূল্য না থাকলেও আল্লাহর কাছে তা অজানা নয়।

হয়তো যে কষ্টে আপনি নীরবে কাঁদছেন, সেটিই আপনার কিছু গুনাহ মোচনের কারণ হচ্ছে। হয়তো কঠিন কোনো পরিস্থিতিতে আপনার ধৈর্য ও ঈমানের কারণে আল্লাহ আপনাকে বিশেষ প্রতিদান দেবেন।

তাই বিপদে ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধারণ করুন। নামাজে দাঁড়ান, আল্লাহর কাছে সাহায্য চান এবং তাঁর রহমতের ওপর আশা রাখুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের সব দুঃখ-কষ্টকে গুনাহ মোচনের উসিলা বানিয়ে দিন। বিপদে ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দিন, অসুস্থদের সুস্থতা দান করুন এবং আমাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version