বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা, দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। ভিন্নমতের মানুষের প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেছেন, ‘শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ চাই’—এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন কোথায়?

সোমবার (২৬ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব মন্তব্য করেন রাশেদ খাঁন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়া হয়েছে। একই পোস্টে এনসিপিকে জামায়াতের ‘প্রক্সি সংগঠন’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মানিক পশারীর জানাজা ও দাফন নিয়ে কী বললেন রাশেদ খাঁন?

ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খাঁন শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর ‘শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ চাই’ বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি অভিযোগ করেন, মানিক পশারী সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষী হওয়ায় তাঁর জানাজা ও দাফন নিয়ে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। রাশেদ খাঁনের দাবি, শেষ পর্যন্ত রাতে পরিবারের সদস্যরা মোবাইল ফোনের আলোয় কবর খুঁড়ে তাঁর দাফন সম্পন্ন করেন।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই যারা ভিন্নমতের মানুষের জানাজা ও দাফন নিয়ে বাধা সৃষ্টি করে, তারা ক্ষমতায় গেলে আরও কঠোর আচরণ করতে পারে। তাঁর মতে, ভিন্নমতের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা সবার নৈতিক দায়িত্ব।

তবে জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগটি রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের ভিত্তিতে এসেছে। ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও উপলব্ধ তথ্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এনসিপিকে ‘প্রক্সি সংগঠন’ বলেও সমালোচনা

নিজের পোস্টে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিয়েও সমালোচনা করেন রাশেদ খাঁন। তাঁর দাবি, দলটির ৮০ শতাংশ নেতাকর্মী জামায়াত-শিবিরের সাবেক নেতাকর্মী। এ ছাড়া জামায়াত রাজনৈতিক চাপে পড়লে দলটিকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে এনসিপির জন্ম হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

রাশেদ খাঁনের আরও অভিযোগ, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের কাছ থেকে আসন পাওয়ার প্রত্যাশায় এনসিপির নেতাদের মধ্যে দলটির প্রতি সমর্থন জানানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বললেও এনসিপি জামায়াতের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার রাজনীতি করছে।

এসব বক্তব্য রাশেদ খাঁনের রাজনৈতিক অভিযোগ ও ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। এনসিপির নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক অতীত কিংবা দলটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁর দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

মানিক পশারী কে ছিলেন?

মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থ থাকার পর তিনি মারা যান। তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে নেওয়ার পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া এবং নিজ এলাকায় দাফন নিয়ে বিরোধ ও উত্তেজনা তৈরি হয়।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বজনেরা অভিযোগ করেন, স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া ও দাফনের উদ্যোগে বাধা দেন। পরে পুলিশি সহায়তায় মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

দাফন নিয়ে বিতর্কে অন্য পক্ষের বক্তব্য

ঘটনাটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে জামায়াতের পক্ষ থেকেও ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। দলটির নেতা মাসুদ সাঈদী দাবি করেছেন, মরদেহের জানাজা বা দাফনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়; আপত্তি ছিল মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় সম্মান হিসেবে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিষয়ে। তাঁর বক্তব্যে মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অন্যদিকে পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুলিশের উপস্থিতিতে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

ফলে ঘটনাটি নিয়ে একাধিক পক্ষের বক্তব্য সামনে এসেছে। জানাজা, দাফন ও গার্ড অব অনার—এই তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা এবং প্রত্যেকটি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা জরুরি।

ভিন্নমতের মানুষের মর্যাদা নিয়ে নতুন বিতর্ক

মানিক পশারীর দাফনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অভিযোগের পাশাপাশি ভিন্নমতের মানুষের প্রতি আচরণ, ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

রাশেদ খাঁন তাঁর বক্তব্যে জামায়াত ও এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও পুলিশের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য ও প্রশাসনের তথ্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যা-ই হোক, একজন মৃত ব্যক্তির মর্যাদা, পরিবারের অধিকার এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version