সমুদ্রে আশানুরূপ মাছ না পাওয়ার পাশাপাশি ডিজেলের দাম বাড়ায় চরম সংকটে পড়েছেন বরগুনার পাথরঘাটার ট্রলার মালিক ও জেলেরা। ইলিশ ধরার ভরা মৌসুম চললেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ না পাওয়ায় অনেক ট্রলার ঘাটে নোঙর করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির বাড়তি খরচে লোকসানের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে।
পাথরঘাটার ট্রলার মালিক আবদুর রহমান জানান, ১৪ জন জেলে ও মাঝিমাল্লা নিয়ে একটি ট্রলার সাত দিনের জন্য সমুদ্রে গেলে জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হয়। সম্প্রতি এক সপ্তাহ সমুদ্রে থাকার পর তার ট্রলার মাত্র ৭০ হাজার টাকার মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরেছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে গুনতে তারা প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়ায় সমুদ্রে ট্রলার পাঠানোর খরচ আরও বেড়েছে।
একই সংকটের কথা জানিয়েছেন অন্য ট্রলার মালিকেরাও। পাথরঘাটার ট্রলার মালিক আবুল ফারাজী জানান, তার চারটি ট্রলার সমুদ্রে মাছ ধরে। একটি ট্রলার প্রতিবার সমুদ্রে পাঠাতে প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হলেও গত সপ্তাহে মাছ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকার। ফলে খরচ তুলে লাভ করা তো দূরের কথা, লোকসান সামলানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
ট্রলার মালিক ও জেলেদের হিসাবে, মাঝারি আকারের একটি ট্রলারে সাত দিনের জন্য প্রায় ৮ ব্যারেল জ্বালানি প্রয়োজন হয়। প্রতিটি ব্যারেলে ২০০ লিটার করে ডিজেল থাকে। প্রতি ব্যারেলে জ্বালানি খরচ প্রায় ৪ হাজার টাকা বাড়ায় একটি মাঝারি ট্রলারে শুধু জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় ৩২ হাজার টাকা। বড় ট্রলারে সাত দিনে প্রায় ১৬ ব্যারেল জ্বালানি প্রয়োজন হওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৬৪ হাজার টাকা।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগটিতে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪ লাখ ২২ হাজার ২৭৫। মাছ ধরার জন্য নিবন্ধিত ছোট আকারের ট্রলারের সংখ্যা ১১ হাজার ৪৩৬টি।
ইলিশ উৎপাদনেও দেখা যাচ্ছে নিম্নমুখী প্রবণতা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নদী ও সাগরের পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যার কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। নদীর মোহনা ও প্রজননক্ষেত্রে দূষণ, অবৈধ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার, নাব্যতা সংকট, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন এবং উপকূলীয় এলাকায় অবকাঠামোগত পরিবর্তন ইলিশের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক আনিসুজ্জামান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, চলতি বছর বরিশাল বিভাগে ইলিশ উৎপাদন গত বছরের তুলনায় আরও কমতে পারে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় পর্যায়েও ইলিশ উৎপাদনে সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। মৎস্য বিভাগের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন। পরের অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে।
দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। এ মাছের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল প্রায় ৭ লাখ জেলে। ফলে সমুদ্রে মাছের ঘাটতি ও জ্বালানির বাড়তি খরচ অব্যাহত থাকলে জেলেদের জীবিকা ও মৎস্য খাতে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
