সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
রাজধানীর ন্যাম ভবনে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে উপজেলা সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন সাতক্ষীরা-মুন্সিগঞ্জ মহাসড়ক থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়। মিছিলটি উপজেলা সদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে গাজী নজরুল ইসলামের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। একই দিনের বিক্ষোভের বিষয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সমাবেশে বক্তারা মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। তাঁরা গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বাতিল ও সাতক্ষীরা-৪ আসনে পুনর্নির্বাচনের দাবিও তোলেন। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ তাঁর ফাঁসির দাবিও জানান।
ন্যাম ভবনে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ঘটনাস্থলে ডিবি, পিবিআই ও সিআইডির ফরেনসিক টিম কাজ করে।
মরিয়মের বাবা এসএম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ গাজী নজরুল ও মাকছুদা বেগমকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে তা প্রমাণিত হয়নি।
আগেই ছিল হত্যাচেষ্টা মামলা
মরিয়মের মৃত্যুর এক দিন আগে, ২০ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুল ইসলাম পল্লবী থানায় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া আট সপ্তাহের জামিনের নথি ঢাকার বিচারিক আদালতে দাখিল করেন।
মরিয়মের মামা ও গাজী নজরুলের সাবেক গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান ২১ জুলাই মামলাটি করেছিলেন। মামলার অভিযোগে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার কথা বলা হয়। ১০ আগস্ট হাইকোর্ট গাজী নজরুলকে ওই মামলায় আট সপ্তাহের আগাম জামিন দেন।
জুলাইয়ে শুরু হয় বিতর্ক
ঘটনার সূত্রপাত জুলাই মাসে। ২০ জুলাই রাতে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক তরুণীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন গাজী নজরুল দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী মরিয়ম খাতুন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭ জুন ঢাকায় পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে হয়।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরদিন, ২১ জুলাই গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন ওবায়দুর রহমান। মামলার অভিযোগে ভিডিও ফাঁসের সন্দেহ ও সম্পর্কের বিরোধের জেরে তাঁকে মারধর এবং শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করার কথা বলা হয়। অভিযোগের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
জামায়াত থেকে বহিষ্কার
২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলটির পক্ষ থেকে ‘নৈতিক স্খলন’-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। পরদিন তাঁকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দেয় জামায়াত।
তবে দল থেকে বহিষ্কার হলেই সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। কমিশনের বক্তব্য ছিল, এ বিষয়ে স্পিকার বা সংসদ থেকে আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স এলে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মরিয়মের মৃত্যুর পর জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাজী নজরুল এখন আর দলের সদস্য নন এবং মৃত্যুর ঘটনাটি ব্যক্তিগত বিষয়; তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এ ঘটনায় কারও দায় রয়েছে কি না, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। এর মধ্যেই শ্যামনগরে বিক্ষোভকারীরা নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিচার এবং তাঁদের উত্থাপিত দাবিগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
