ভেনেজুয়েলার মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন জ্বালানি বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তাঁর দাবি, ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে, যার মধ্যে ৫ লাখেরও বেশি ব্যারেল যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলোতে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে একটি শিল্প সম্মেলনে মার্কিন জ্বালানি বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি কাইল হাউস্টভেইট এ তথ্য জানান।
ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র
হাউস্টভেইট বলেন, ভেনেজুয়েলার যে ধরনের ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ অপরিশোধিত তেল উৎপাদিত হয়, তা প্রক্রিয়াজাত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের বেশ কিছু শোধনাগার বিশেষভাবে তৈরি।
ফলে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল আমদানি পুনরায় বাড়ায় দেশটির উপসাগরীয় অঞ্চলের শোধনাগারগুলো সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেলের মজুত বিশ্বের সবচেয়ে বড়। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাবে দেশটির মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বের মোট প্রমাণিত মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ।
তবে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ
মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রও সহযোগিতা করছে। দেশটিতে প্রতিদিন ১ লাখ ব্যারেলের বেশি ন্যাফথা পাঠানো হচ্ছে, যা ভারী অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়।
হাউস্টভেইট দুই দেশের এই জ্বালানি বাণিজ্যকে ‘এনার্জি পার্টনারশিপ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর ভাইস প্রেসিডেন্ট জোভানি মার্টিনেজ জানিয়েছেন, আগস্টের শেষ নাগাদ দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন প্রতিদিন ১২ লাখ ৪৫ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে। চলতি বছরে দেশটির তেল রপ্তানিও বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মার্টিনেজ বলেন, তেল উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার শোধনাগারগুলো আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ নিয়ে প্রশ্ন
ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে বলে Financial Times জানিয়েছে।
তবে মার্কিন প্রশাসন এই অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ এমন একটি হিসাবে জমা হচ্ছে, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি থাকবে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারকে ওই অর্থ ব্যবহারের জন্য মাসিক বাজেট চাওয়ার ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক
ভেনেজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ ও দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও বিতর্ক রয়েছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার তেল, সোনা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ থেকে অর্জিত অর্থের পরিমাণ ও ব্যবহার নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই।
বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়, জবাবদিহির ব্যবস্থা ও স্পষ্ট গণতান্ত্রিক রোডম্যাপ ছাড়া ভেনেজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছে।
ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা বাড়ার পাশাপাশি দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
Source: Aljazeera

