হিমালয় থেকে নেমে আসা ভয়াবহ ভুটেকোশি বন্যা আবারও জলবায়ু সংকট ও হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির দিকে বিশ্বের দৃষ্টি টেনেছে। ২৬ আগস্টের এই দুর্যোগে বরফ, পাথর, পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত উপত্যকার ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক ও যানবাহন ভাসিয়ে নেয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৯০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ।
দুর্যোগটি হঠাৎ ঘটে গেলেও এর পেছনের ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল। হিমবাহের দ্রুত গলন, পরিবর্তিত ক্রায়োস্ফিয়ার, অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, বরফধস, পাথরধস বা ধ্বংসাবশেষের স্রোতে লহেন্দে নদীর পানি সাময়িকভাবে আটকে যায়। পরে হঠাৎ সেই পানি ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ প্রবাহ নিচের দিকে নেমে আসে। পরবর্তী উপগ্রহচিত্র ও বিশ্লেষণে হিমবাহ ধসে বরফ-পাথরের বিশাল স্রোতকে সম্ভাব্য মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এটি হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা (GLOF), বরফ-পাথর ধস, ভূমিধসজনিত বন্যা কিংবা এসবের সম্মিলিত কোনো প্রক্রিয়া—তা নিয়ে এখনো বিশ্লেষণ চলছে।
ভুটেকোশি দুর্যোগের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ১৭ জুলাই নেপালের নাগরকোটে বিজ্ঞানী, হিমবিজ্ঞানী, জলবিদ, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের এক সম্মেলনে হিমালয়ের অস্থিতিশীল ক্রায়োস্ফিয়ার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে GLOF-এর ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
হিমালয়ে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের থামে দুর্যোগে হিমবাহের একটি ধস হিমবাহ-হ্রদে পড়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করেছিল। ICIMOD-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার ঘনমিটার পানি নিঃসৃত হয় এবং এভারেস্ট অঞ্চলকে GLOF-এর উচ্চঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লহেন্দে নদীতেও হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার কথা জানিয়েছিল নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ।
ICIMOD-UNDP-এর একটি তালিকা অনুযায়ী, শুধু নেপালের কোশি, গান্ডাকি ও কার্নালি অববাহিকাতেই ২ হাজার ৭০টি হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে প্রতিটি হিমবাহ, হ্রদ ও পাহাড়ি ঝুঁকি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা নেপালের মতো দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) নেপালে GLOF-এর ঝুঁকি কমাতে ৩ কোটি ৬১ লাখ ডলারের একটি সহায়তা অনুমোদন করে। এর মধ্যে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়ও রয়েছে। তবে প্রকল্পটি অনুমোদন পেতে সাত বছর সময় নেওয়ায় জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়নের ধীরগতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নেপালের মতো দেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে খুব সামান্য অবদান রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর ওপর দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। তাই এই ঝুঁকি শুধু নেপালের নয়; এটি বাংলাদেশ, ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের প্রয়োজন স্থায়ী হিমালয় ক্রায়োস্ফিয়ার ও GLOF পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ অবকাঠামো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো এবং স্থানীয় জনগণের প্রস্তুতি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন আরও দ্রুত ও কার্যকর করা জরুরি।
২৬ আগস্টের এই দুর্যোগ হিমালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় একটি সতর্কবার্তা। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিশ্ব এই সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা নেবে, নাকি পরবর্তী আরও বড় বিপর্যয়ের পর আবার প্রতিক্রিয়া জানাবে?
