আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নয়াদিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত এবারের সম্মেলনে রাশিয়া, চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতৃত্বে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়েছে নয়াদিল্লি।

২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলন ভারতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ব্রাজিলের কাছ থেকে জোটটির ঘূর্ণায়মান সভাপতিত্ব নেয় ভারত। এ বছর ভারতের ঘোষিত মূল প্রতিপাদ্য—‘Building for Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability’ বা স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়া।

আরও বড় হয়েছে ব্রিকস

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বর্তমানে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়াও জোটটির সদস্য। ফলে ১১ সদস্যের সম্প্রসারিত ব্রিকস এখন আগের তুলনায় আরও বড় অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

তবে সদস্যসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোটের ভেতরের মতপার্থক্যও বেড়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক, বৈশ্বিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও ডি-ডলারাইজেশন নিয়ে সদস্য দেশগুলোর অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

রাশিয়া-চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, পশ্চিমের সঙ্গেও ভারসাম্য

রাশিয়া ও চীন ব্রিকসকে পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও কার্যকর করতে আগ্রহী। বিপরীতে ভারত ব্রিকসকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী জোটে পরিণত করার ধারণাকে সমর্থন করে না। নয়াদিল্লির অবস্থান হলো—ব্রিকস ‘non-Western’, কিন্তু ‘anti-Western’ নয়।

ভারতের জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও কোয়াডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে একই ব্রিকস প্ল্যাটফর্মে রয়েছে। ফলে সম্মেলনে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয় করাই ভারতের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

চীনের সঙ্গে সীমান্ত, রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা

চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে কিছু অগ্রগতি হলেও দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অবিশ্বাস এখনো রয়েছে। ব্রিকসকে বেইজিং নিজের আঞ্চলিক কৌশল এগিয়ে নেওয়ার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে—এমন আশঙ্কাও ভারতের রয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও জ্বালানি আমদানিতে মস্কোর ওপর ভারতের নির্ভরতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ সামলানোও নয়াদিল্লির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ডলারবিরোধী অবস্থানে ভারতের ভিন্ন পথ

ব্রিকসের আলোচনায় ডি-ডলারাইজেশন অন্যতম বিতর্কিত বিষয়। রাশিয়া ও চীন আন্তর্জাতিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের প্রাধান্য কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা ও এমনকি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রার ধারণাও সামনে এনেছে।

তবে ভারত অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালুর পক্ষে নয়। বরং দ্বিপক্ষীয়ভাবে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি এবং জাতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে নয়াদিল্লি।

পশ্চিম এশিয়ার সংকটও বড় ইস্যু

ব্রিকস সম্প্রসারণের ফলে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসরসহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশের স্বার্থ এখন জোটের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু এসব দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা-অগ্রাধিকারে পার্থক্য থাকায় অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

ভারত চায় সম্মেলনে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে।

ডিজিটাল অবকাঠামো ও বৈশ্বিক দক্ষিণে নেতৃত্ব

বিতর্কিত ভূরাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি ভারত উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সামনে রাখতে চায়। ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা ডিপিআই এ ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ভারত তার ‘ইন্ডিয়া স্ট্যাক’ মডেল—আধার, ইউপিআই ও ডিজিটাল নথি যাচাই ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা—ব্রিকস ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবিও ভারতের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি রূপান্তর নিয়েও আলোচনা এগিয়ে নিতে চায় নয়াদিল্লি।

বড় পরীক্ষা ভারতের

বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের সময়ে ব্রিকসের নেতৃত্ব ভারতের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। রাশিয়া-চীনসহ সদস্য দেশগুলোর ভিন্নমত সামলে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করতে পারলে বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে।

অন্যদিকে মুদ্রা, বাণিজ্য ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিভাজন যদি সম্মেলনের মূল এজেন্ডাকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে সম্প্রসারিত ব্রিকসের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version