গেম ডেস্ক
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় আসর। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ফুটবল ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। তবে সেই বিশ্বকাপজয়ী দলের এমন এক সদস্য ছিলেন, যিনি পুরো টুর্নামেন্টে এক মিনিটও মাঠে নামেননি—হেক্টর জেলাদা।
জেলাদা ছিলেন আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলরক্ষক। বিশ্বকাপে তিনি কোনো ম্যাচ খেলেননি, এমনকি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর ম্যাচসংখ্যাও শূন্য। তবু বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে লেখা আছে।
আর্জেন্টিনা দলে জায়গা পাওয়ার গল্প
জেলাদা ফুটবলে ক্যারিয়ার শুরু করেন রোসারিও সেন্ট্রালে। ১৯৭৯ সালে তিনি আর্জেন্টিনা ছেড়ে মেক্সিকোয় পাড়ি জমান এবং ক্লাব আমেরিকায় যোগ দেন। সেখানে দ্রুতই নিজেকে মেক্সিকান ফুটবলের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫—টানা তিন বছর মেক্সিকোর সেরা গোলরক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন জেলাদা। তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার স্কোয়াডে জায়গা করে দেয়।
তবে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর কোনো ম্যাচ খেলা হয়নি। কোচ কার্লোস বিলার্দো তাঁকে মূলত তৃতীয় গোলরক্ষক হিসেবেই দলে রেখেছিলেন।
সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক ছিলেন নেরি পম্পিদো। বিকল্প হিসেবে ছিলেন লুইস ইসলাস। আর তৃতীয় গোলরক্ষক হিসেবে ছিলেন মেক্সিকোপ্রবাসী জেলাদা।
ম্যারাডোনার সেই নীল জার্সির নেপথ্যে
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে নীল জার্সি পরে খেলতে হয়েছিল। সেই ম্যাচেই ম্যারাডোনা করেন বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দুই গোল।
এই নীল জার্সি মাঠে পৌঁছানোর পেছনেও ছিল জেলাদার ভূমিকা।
জেলাদার নিজের একটি ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান ছিল। এ কারণে সে সময় আর্জেন্টিনার জার্সি সরবরাহকারী ফরাসি প্রতিষ্ঠান Le Coq Sportif-এর সঙ্গে তাঁর ভালো যোগাযোগ ছিল। ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে যখন দ্রুত বিকল্প নীল জার্সির প্রয়োজন হয়, তখন সেই যোগাযোগ কাজে লাগে। জেলাদাই দ্রুত জার্সি সংগ্রহ ও তৈরির ব্যবস্থা করতে সহায়তা করেন।
অর্থাৎ, যে জার্সি পরে ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত মুহূর্তগুলোর জন্ম দেন, সেই জার্সির নেপথ্যেও ছিলেন এমন একজন, যিনি নিজে কখনো আর্জেন্টিনার জার্সি পরে বিশ্বকাপে মাঠে নামতে পারেননি।
মেক্সিকোর হয়ে খেলার সুযোগও এসেছিল
বিশ্বকাপের আগে জেলাদাকে মেক্সিকোর জাতীয় দলের হয়ে খেলার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। মেক্সিকোর ফুটবল কর্তারা তাঁকে নাগরিকত্ব নেওয়ার মাধ্যমে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তবে আন্তর্জাতিক যুব পর্যায়ে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলায় মেক্সিকোর জাতীয় দলে তাঁর খেলা আর সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ডাকেই সাড়া দেন তিনি এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হন।
বিশ্বকাপজয়ী, কিন্তু জাতীয় দলে ম্যাচ শূন্য
ফুটবলের ইতিহাসে বিশ্বকাপ জেতা খেলোয়াড়ের সংখ্যা অনেক। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে একটি ম্যাচও না খেলে বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
হেক্টর জেলাদার কাহিনি তাই শুধু একজন তৃতীয় গোলরক্ষকের গল্প নয়; এটি বিশ্বকাপ ফুটবলের নেপথ্যে থাকা এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি মাঠে না নেমেও ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তোলার সেই গৌরব তাঁর রয়েছে, অথচ আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর আন্তর্জাতিক ম্যাচসংখ্যা রয়ে গেছে শূন্য—ফুটবলে এমন বৈপরীত্য সত্যিই বিরল।

