নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক রিপোর্ট

রাজধানীর মিরপুরের বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর এক নবজাতকের মৃত্যু ঘিরে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল এলাকায় রোগীর স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরে মিরপুর থানার ওসি (অপারেশন) মিজানুর রহমানসহ পুলিশের একাধিক সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। হাসপাতালের কর্মরত আনসার সদস্যরাও পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ করেন।

ঘটনার পর বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মো. হাসান ঘটনাস্থলে এসে এলাকাবাসীর সামনে দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ভুক্তভোগী রোগী অনন্যা রহমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।

এদিকে, এ ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসক প্রফেসর ডা. নাসরিন বেগমের বিরুদ্ধে মিরপুর মডেল থানায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী রোগীর স্বামী মো. ফজলুর রহমান চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

নির্ধারিত সময়ে সিজার না করার অভিযোগ

মামলার বাদী মো. ফজলুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রী অনন্যা রহমান গর্ভবতী হওয়ার পর প্রায় নয় মাস ধরে ডা. নাসরিন বেগমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তাঁর সিজারিয়ান অপারেশন করার কথা ছিল।

ফজলুর রহমানের অভিযোগ, নির্ধারিত দিনে স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডা. নাসরিন বেগম জানান, ওই দিন অপারেশন করা সম্ভব হবে না। এমনকি পরবর্তী দুই দিনও ব্যস্ততার কারণে অপারেশন করা সম্ভব হবে না বলে জানান তিনি।

এরপর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৩ আগস্ট অনন্যা রহমানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে জানান বাদী।

দুই ঘণ্টা পর নবজাতকের মৃত্যুর খবর

বাদীর দাবি, হাসপাতালে ভর্তির পর রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় দ্রুত সিজারিয়ান অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসক। অপারেশন শুরুর পর প্রায় দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের অবস্থা সম্পর্কে পরিবারকে স্পষ্ট কোনো তথ্য জানানো হচ্ছিল না বলে অভিযোগ করেন ফজলুর রহমান।

একপর্যায়ে স্ত্রী ও সন্তানের অবস্থা জানতে চাইলে চিকিৎসক নাসরিন বেগম জানান, শিশুর অবস্থা ভালো নয় এবং চিকিৎসকেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। পরে পরিবারকে জানানো হয়, নবজাতককে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

ফজলুর রহমানের অভিযোগ, এরপর চিকিৎসক দ্রুত হাসপাতাল থেকে চলে যান এবং রোগীর পরবর্তী চিকিৎসা ও পরিস্থিতি নিয়ে পরিবারকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করা হয়নি।

হাসপাতালে উত্তেজনা, পুলিশ মোতায়েন

নবজাতকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষুব্ধ হয়ে রোগীর স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা হাসপাতাল এলাকায় জড়ো হলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মিরপুর থানার ওসি (অপারেশন) মিজানুর রহমানসহ পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। হাসপাতালের আনসার সদস্যরাও সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। পরে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত কারণ

নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা এখন তদন্তের বিষয়। এ ক্ষেত্রে রোগীর চিকিৎসা নথি, অপারেশনের কাগজপত্র, হাসপাতালের রেকর্ড, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র, অপারেশন থিয়েটারের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ফরেনসিক মতামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাদী ফজলুর রহমানের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় একই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে অপারেশন না হওয়া এবং পরে জরুরি অবস্থায় সিজারিয়ান অপারেশনের পর নবজাতকের মৃত্যু—পুরো ঘটনাপ্রবাহের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

চিকিৎসকের বক্তব্য

ঘটনার বিষয়ে চিকিৎসক প্রফেসর ডা. নাসরিন বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে জানান, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি দাবি করেন, রোগী ও নবজাতককে বাঁচাতে তাঁর সাধ্য অনুযায়ী যথাযথ চেষ্টা করেছেন।

তবে ঘটনার বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করার জন্য তিনি প্রতিবেদককে একাধিকবার অনুরোধ করেন।

অন্যদিকে, বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

মামলা ও অভিযোগের পর এখন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ হবে, নবজাতকের মৃত্যু চিকিৎসাজনিত জটিলতার কারণে হয়েছে, নাকি চিকিৎসায় কোনো ধরনের গাফিলতি বা অবহেলা ছিল।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা হোক। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version