লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল–মানদেব প্রণালি এখন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। কৌশলগত এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ, আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন এবং জ্বালানি ব্যয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে বাব আল–মানদেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল। শুক্রবার তারা প্রণালিটির পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের বন্দরনগর মোখা এবং কৌশলগত পেরিম দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বাব আল–মানদেবের গুরুত্ব সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনে এই নৌপথের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। ফলে বাব আল–মানদেবেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তেল পরিবহনে বড় ধাক্কা

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথে যেত।

হরমুজে বাধা তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাতে শুরু করে। একপর্যায়ে ওই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে বলে জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বাব আল–মানদেব দিয়ে পরিবহন করা হতো।

কিন্তু হুতিদের হামলার হুমকিতে আগস্টে বাব আল–মানদেব দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তা আরও কমেছে বলে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন।

বিকল্প পথে তেল পরিবহন করতে গিয়ে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগর হয়ে এশিয়ায় যেতে হচ্ছে। এতে যাত্রার সময় প্রায় এক মাস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজভাড়া, জ্বালানি ও বিমা ব্যয়ও বাড়ছে।

বাড়তে পারে তেলের দাম

বাব আল–মানদেব ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারে উঠলেও পরে তা প্রায় ১০৪ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও বেড়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া, সৌদি আরবের তেল উৎপাদন কমানো এবং রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার মতো ঘটনাগুলো একসঙ্গে তেলের বাজারে সরবরাহ-ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এশিয়ার শোধনাগারগুলোও বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে বেশি দাম দিচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ডিজেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা

অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদিত ডিজেল বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। ট্রাক, ট্রাক্টর, মালবাহী ট্রেনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক পরিবহনে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। শুক্রবার দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে বলে এএএর তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামেও পড়ে। বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ানোর পথে যেতে পারে। এতে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণের খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের মূল্যস্ফীতিতেও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

জাহাজগুলো এখন আরও ঝুঁকির মুখে

বাব আল–মানদেব এড়িয়ে চলার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন নয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদে এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করেছিল হুতিরা। এরপর অনেক কোম্পানি নিরাপত্তার কারণে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ বেছে নেয়।

এর ফলে পণ্য পরিবহনে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লেগেছে। বেড়েছে জ্বালানি, বিমা ও নাবিকদের মজুরি ব্যয়ও।

পণ্য পরিবহনের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান জেনেটার হিসাবে, আগের তুলনায় বাব আল–মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে। সাম্প্রতিক সংঘাত বেড়ে যাওয়ার পর গত দুই দিনে তা আরও ৪৬ শতাংশ কমেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

তবে পুরোপুরি জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় কিছু জাহাজ কোম্পানি ঝুঁকি নিয়েই চলাচল চালিয়ে যেতে পারে।

তবু বাব আল–মানদেব দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজ এখন সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হয়ে উঠেছে—এমন সতর্কতাও রয়েছে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্ববাণিজ্য, জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতেও।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version