বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ও স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য চলাচলে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়েছে। তবে একই সময়ে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ ১০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার।
ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখনও অনেক বেশি। সর্বশেষ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে যত পণ্য আমদানি করেছে, তার তুলনায় রপ্তানি করেছে ছয় ভাগের এক ভাগেরও কম।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতীয় সুতা, তুলা, কাপড়সহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা বাংলাদেশে এখনও বেশি। দামের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার পাশাপাশি কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা নির্দিষ্ট ধরনের সুতা ও কাপড় ব্যবহারের শর্ত দেওয়ায় ভারত থেকে এসব পণ্য আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
চীনের পর ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও দেশটির রপ্তানি পণ্যের তালিকা পোশাকনির্ভর হওয়ায় বড় ধরনের সম্প্রসারণ হচ্ছে না। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ভারতের নিজস্ব বিকল্প পণ্য, কঠোর মানদণ্ড এবং দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খল গড়ে না ওঠা বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির পথে বড় বাধা।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (CEPA) স্বাক্ষরেরও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
গত দুই বছরে দুই দেশই একাধিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্থানীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্প সুরক্ষায় স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেয়। পরে এনবিআর স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি সীমিত করে এবং বর্তমানে ভারত থেকে সুতা আমদানির জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
অন্যদিকে ভারত স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পোশাক, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, আসবাবসহ কয়েক ধরনের পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। একই সময়ে বাংলাদেশি পণ্য তৃতীয় দেশে পাঠাতে ভারতীয় বিমানবন্দর ব্যবহার করে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধাও স্থগিত করা হয়।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার পরও ভারত থেকে আমদানি কমেনি। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে সুতা আমদানির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
তিনি বলেন, স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ বা সীমিত করার ফলে সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি বেড়েছে এবং এতে আগে চলা অনানুষ্ঠানিক বা চোরাচালানও কমেছে।
অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, স্থলবন্দর দিয়ে আরও বেশি বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা দরকার।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, সাম্প্রতিক বাণিজ্যবিরোধের পেছনে বাণিজ্যিক কারণ থাকলেও এর সমাধান রাজনৈতিক পর্যায়েই হতে পারে। অন্য বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নতি হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে বাজারসুবিধা বাড়ানো, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনা এবং স্থলবন্দর ব্যবহারে জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা।

