নিজের জমিতে বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে জমির চারপাশে কতটুকু জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে। অথচ ভবনের নকশা অনুমোদন, আলো-বাতাস চলাচল, অগ্নিনিরাপত্তা ও পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ছেড়ে দেওয়া জরুরি। নিয়ম না মেনে বাড়ি নির্মাণ করলে আইনি জটিলতা, জরিমানা এমনকি অবৈধ অংশ অপসারণের নির্দেশও আসতে পারে।

বাংলাদেশে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) ২০২০ অনুসরণ করতে হয়। পাশাপাশি ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বিধিমালাও রয়েছে। ফলে জমির আয়তন, রাস্তার প্রস্থ, ভবনের উচ্চতা ও এলাকার ধরন অনুযায়ী জায়গা ছাড়ার পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

বাড়ি নির্মাণের আগে যেসব বিষয় যাচাই করতে হবে

বাড়ি নির্মাণের আগে জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। এরপর অনুমোদিত স্থপতি বা প্রকৌশলীর মাধ্যমে ভবনের নকশা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে।

ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, ভূমিকম্প সহনশীলতা, অগ্নিনিরাপত্তা, আলো-বাতাস চলাচল এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও নকশায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বাড়ির সামনে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে?

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-২০২০-এর ১.৮.৮ ধারা অনুযায়ী, ভবনের সামনের খোলা জায়গা বা সেটব্যাক রাস্তার কেন্দ্র থেকে কমপক্ষে ৪ দশমিক ৫ মিটার অথবা জমির সামনের সীমানা থেকে কমপক্ষে ১ দশমিক ৫ মিটার দূরে রাখতে হবে। এই দুই হিসাবের মধ্যে যেটি বেশি, সেটি প্রযোজ্য হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বিধিমালা বা ভবিষ্যতে রাস্তা প্রশস্ত করার পরিকল্পনা থাকলে সেই নির্দেশনাও অনুসরণ করতে হবে।

পেছনে ও দুই পাশে কতটুকু জায়গা রাখতে হবে?

ভবনের পেছনে ও দুই পাশে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে, তা জমির পরিমাণ, ভবনের ধরন ও তলার সংখ্যার ওপর নির্ভর করে।

BNBC ২০২০-এর ১.৮.৯ ধারা ও ৩.১.৫ নম্বর সারণিতে বিভিন্ন ধরনের ভবনের জন্য আলাদা নির্দেশনা রয়েছে। যেমন, নির্দিষ্ট শর্তে ১০ তলা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে জমির আয়তন অনুযায়ী পাশ ও পেছনের দূরত্ব আলাদা হতে পারে।

ঢাকায় নতুন বিধিমালায় কী বলা হয়েছে?

ঢাকা মহানগরের জন্য ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ‘ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০২৫’ গেজেট প্রকাশিত হয়। বিধিমালাটি ঢাকার মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকায় কার্যকর হয়েছে।

এই বিধিমালার ৪১ নম্বর বিধি অনুযায়ী, রাস্তার কেন্দ্র থেকে ৪ দশমিক ৫ মিটার অথবা জমির সামনের সীমানা থেকে ১ দশমিক ৫ মিটার—যেটি বেশি, তার চেয়ে কম দূরত্বে ভবন নির্মাণ করা যাবে না। তবে ভবিষ্যতে রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য জমি ছাড়ার প্রয়োজন হলে সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

ঢাকার ক্ষেত্রে ভবনের তলা অনুযায়ী পাশ ও পেছনের ন্যূনতম সেটব্যাকের পরিমাণও নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী:

ভবনের তলা দুই পাশের দূরত্ব পেছনের দূরত্ব
৭ তলা পর্যন্ত ১ মিটার ১.২৫ মিটার
৮–১০ তলা ১.২৫ মিটার ২ মিটার
১১–১৫ তলা ৩ মিটার ৩ মিটার
১৬–২০ তলা ৩.২৫ মিটার ৩.২৫ মিটার
২১–৩০ তলা ৩.৫০ মিটার ৩.৫০ মিটার
৩১–৪০ তলা ৪.৫০ মিটার ৪.৫০ মিটার
৪০ তলার বেশি ৫ মিটার ৫ মিটার

এগুলো ঢাকা মহানগরের বিধিমালার সারণি অনুযায়ী ন্যূনতম দূরত্ব। বিশেষ ব্যবহার, জমির অবস্থান ও অন্যান্য শর্তে অতিরিক্ত জায়গা ছাড়ার প্রয়োজন হতে পারে।

জমির কত শতাংশ খোলা রাখতে হবে?

BNBC ২০২০-এর ১.৮.৪ ধারা অনুযায়ী, সাধারণ আবাসিকসহ অধিকাংশ শ্রেণির ভবনের প্লটে মোট জমির অন্তত ৩৩ শতাংশ খোলা রাখতে হয়। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ হার অন্তত ৫০ শতাংশ।

এ ছাড়া কোডের ১.৮.২ ধারা অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক খোলা জায়গার অন্তত ৫০ শতাংশ পানি মাটিতে প্রবেশ করতে পারে এমন অবস্থায় রাখতে হবে।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগরের ২০২৫ সালের বিধিমালায় সাধারণ আবাসনের জন্য ২৫ শতাংশ বাধ্যতামূলক অনাবৃত জায়গা এবং বৃষ্টির পানি শোষণের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা সংরক্ষণের বিধান রয়েছে।

নিয়ম না মেনে বাড়ি নির্মাণ করলে কী হতে পারে?

অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে ভবন নির্মাণ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্মাণকাজ বন্ধ, জরিমানা কিংবা অবৈধ অংশ অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

ভবনের কারণে প্রতিবেশীর জমিতে অনধিকার প্রবেশ, আলো-বাতাস চলাচলে বাধা কিংবা পানি নিষ্কাশনে সমস্যা তৈরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিও আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।

এ ছাড়া পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকলে অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের সময় উদ্ধারকাজ পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।

অনুমোদন ছাড়া বাড়ি নির্মাণ করলে বৈধ করার সুযোগ আছে?

অনুমোদন ছাড়া নির্মিত ভবন পরবর্তী সময়ে নিয়মিতকরণের সুযোগ সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। ভবনের অবস্থান, নির্মাণের ধরন, নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিমালার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।

কিছু ক্ষেত্রে সংশোধিত নকশা জমা দিয়ে অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে সরকারি জমি বা রাস্তা দখল করে কিংবা বাধ্যতামূলক নির্মাণবিধি লঙ্ঘন করে তৈরি ভবন বৈধ করার নিশ্চয়তা নেই।

ভবনের উচ্চতা ও তলার সংখ্যা কীভাবে নির্ধারিত হয়?

জমির আয়তন দেখেই কত তলা ভবন নির্মাণ করা যাবে, তা নির্ধারণ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে রাস্তার প্রস্থ, এলাকার ধরন, ফ্লোর এরিয়া রেশিও (FAR), ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (DAP) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিমালা বিবেচনায় নিতে হয়।

বিশেষ করে ঢাকায় রাজউকের অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা ও নির্মাণযোগ্য আয়তন নির্ধারিত হয়।

পানি নিষ্কাশন ও অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা

বাড়ি নির্মাণের সময় সেপটিক ট্যাংক, সোকওয়েল, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন এবং প্রয়োজনীয় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভবনের ধরন ও উচ্চতা অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি নির্গমনপথ ও নিরাপদ সিঁড়ির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

নির্মাণকাজ চলাকালে শ্রমিকদের হেলমেট, সুরক্ষাজুতা ও সেফটি বেল্ট ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নির্মাণকাজের কারণে প্রতিবেশী ও পথচারীদের নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

সব মিলিয়ে বাড়ি নির্মাণের আগে জমির কাগজপত্র যাচাই, অনুমোদিত নকশা তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিমালা অনুসরণ করা জরুরি। এতে ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা এড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version