ঢাকা | ৭ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশে রান্নায় ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) অক্টোবরের নির্ধারিত দামে প্রতি কেজি এলপিজির মূল্য ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। এরই মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এই সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন IndianOil-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৪ দশমিক ২ কেজির নন-সাবসিডাইজড এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯৬৮ রুপি। ৬ অক্টোবরের বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হারে প্রতি ভারতীয় রুপি প্রায় ১.২৮ টাকা ধরলে, কলকাতায় প্রতি কেজি এলপিজির দাম প্রায় ৮৭ টাকা হয়।
অর্থাৎ কেজিপ্রতি হিসাবে বাংলাদেশে নির্ধারিত দাম কলকাতার তুলনায় প্রায় ৭৬ শতাংশ বেশি। একই হারে কলকাতার ১২ কেজি এলপিজির সমতুল্য দাম প্রায় ১ হাজার ৪৫ টাকা, যেখানে বাংলাদেশে নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। তবে দুই দেশের কর, ভর্তুকি, বিতরণব্যবস্থা ও বাজার কাঠামো এক নয়—তাই এই হিসাব মূলত দামের পার্থক্য বোঝানোর তুলনা হিসেবে দেখা উচিত।
নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি
বাংলাদেশে বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে বাজারে সেই দাম অনেক সময় কার্যকর হচ্ছে না। অক্টোবর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে এই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খুচরা বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার কাছাকাছি দামে বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে কয়েক শ টাকা।
কেন বাংলাদেশে এলপিজি তুলনামূলক ব্যয়বহুল?
এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের বড় সমস্যা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। গভীর সমুদ্রে বড় আকারের এলপিজি টার্মিনাল ও পর্যাপ্ত মজুত সুবিধা না থাকায় তুলনামূলক ছোট জাহাজে গ্যাস আমদানি করতে হয়। এতে পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যায়।
বিইআরসির পক্ষ থেকেও পরিবহন ও অবকাঠামোগত ব্যয়কে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বড় আকারের টার্মিনাল ও মজুতাগার তৈরি হলে আমদানি ব্যয় কমার পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাও উন্নত হতে পারে।
সরবরাহ সংকটে বাড়ছে খুচরা দাম
সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে এলপিজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে কিছু কোম্পানি সরবরাহ কমিয়ে দেয়। কোথাও কোথাও চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম সিলিন্ডার সরবরাহ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ও আগস্টে এলপিজি আমদানি মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। অর্থাৎ আমদানির পরিমাণ খুব বেশি কমে না গেলেও সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হওয়ায় খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
ঢাকার বাইরে দাম কিছুটা কম
এলপিজির বাজারদরের আরেকটি বড় অসঙ্গতি হলো অঞ্চলভেদে দামের পার্থক্য। দেশের বিভিন্ন শহরে একই ১২ কেজি সিলিন্ডার ঢাকার তুলনায় কম দামে বিক্রি হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—পরিবহন ব্যয়ের যুক্তি থাকলেও ঢাকার বাজারে কেন এত বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, শুধু নতুন করে দাম নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নির্ধারিত মূল্য বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, সরবরাহ ঠিক আছে কি না এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয়েও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
ভোক্তার ওপর চাপ
দেশে বিপুলসংখ্যক পরিবার রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে শুধু মাসিক মূল্য সমন্বয় যথেষ্ট নয়। আমদানি অবকাঠামো উন্নয়ন, বড় মজুতাগার তৈরি, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সবশেষে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—প্রতিবেশী দেশের তুলনায় যখন বাংলাদেশে এলপিজির নির্ধারিত দামই অনেক বেশি, তখন নির্ধারিত সেই দামও কেন বাজারে কার্যকর করা যাচ্ছে না? এ প্রশ্নের সমাধান না হলে রান্নার জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর আরও চাপ তৈরি করবে।

