জাতীয় | জ্বালানি ও প্রযুক্তি | ১০ অক্টোবর ২০২৬
বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মানববর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করে জ্বালানি তেল উৎপাদনের এ উদ্যোগ সফল হলে দেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনী পরিদর্শনকালে তিনি এ আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা এ তথ্য জানান।
বর্জ্য থেকে তেল উৎপাদনে গবেষকদের অগ্রগতি
প্রকল্পটির গবেষকদের মধ্যে রয়েছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে গবেষণার অগ্রগতি, উদ্ভাবিত প্রযুক্তি এবং দেশে বাণিজ্যিকভাবে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।
গবেষকেরা মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জৈব অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তাঁদের লক্ষ্য, সাধারণত পরিত্যক্ত হিসেবে বিবেচিত এসব উপাদানকে জ্বালানি উৎপাদনের কাজে লাগানো।
কীভাবে তৈরি হবে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল?
প্রকল্পটিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন’ (HTL) প্রযুক্তি। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও উচ্চচাপের পরিবেশে ভেজা জৈব বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে জৈব অপরিশোধিত তেল বা ‘বায়োক্রুড’ উৎপাদন করা হয়।
প্রায় ১০ বছর ধরে পরিচালিত গবেষণায় কুয়েটের গবেষকেরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পেয়েছেন। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাগারে প্রক্রিয়াকৃত বর্জ্য থেকে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনেও সাফল্যের কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে পরীক্ষাগারের ফলাফলকে সরাসরি বাণিজ্যিক উৎপাদনের সমান ধরে নেওয়া যাবে না। বড় পরিসরে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয় এবং জ্বালানির গুণগত মান যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের পরিকল্পনা
গবেষণার পরবর্তী ধাপে প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয় এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। প্রকল্পটির জন্য সরকারি সহযোগিতা পেলে পরীক্ষাগারের গবেষণা থেকে শিল্প পর্যায়ে যাওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটির কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত হন। এর সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
বছরে হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা
গবেষকদের ধারণা, প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তাঁদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এতে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
তবে এই হিসাব সম্ভাব্য ফলাফলের পূর্বাভাস। বাস্তবে কতটা তেল উৎপাদন করা সম্ভব হবে এবং কতটা আমদানি কমানো যাবে, তা নির্ভর করবে পাইলট প্ল্যান্টের ফলাফল, প্রযুক্তির ব্যয়, বর্জ্যের প্রাপ্যতা ও বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতার ওপর।
জ্বালানি সংকট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। অন্যদিকে নগরাঞ্চলে রান্নাঘরের বর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
এ অবস্থায় বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রযুক্তি সফল হলে একই সঙ্গে দুটি ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। একদিকে বর্জ্যের ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে দেশীয়ভাবে বিকল্প জ্বালানি তৈরির সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গবেষকদের প্রত্যাশা, সরকারি সহযোগিতায় প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং পরিবেশদূষণ হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রদর্শনীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
তথ্যসূত্র: বাসস

