মালয়ালম সিনেমার ক্রাইম-থ্রিলার মানেই রহস্য, টানটান উত্তেজনা আর গল্পের অপ্রত্যাশিত মোড়। এই ধারার সিনেমার কথা উঠলেই প্রথমে মনে পড়ে জিতু জোসেফের ‘দৃশ্যম’-এর নাম। তবে এবার সেই সিনেমার সঙ্গে তুলনায় উঠে এসেছে নতুন মালয়ালম থ্রিলার ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’। সিনেমাটি দেখার পর অনেক দর্শকের দাবি, কিছু দিক থেকে এটি ‘দৃশ্যম’-কেও ছাড়িয়ে গেছে।
শাহাদ পরিচালিত সিনেমাটি গত মাসে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে। গত ৯ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে মুক্তির পরও এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি ‘দৃশ্যম’-এর মতো জনপ্রিয় থ্রিলারকে টেক্কা দেওয়ার মতো সিনেমা এটি?
একনজরে সিনেমা
নাম: প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার
ধরন: ক্রাইম-থ্রিলার
পরিচালক: শাহাদ
অভিনয়: পার্বতী থিরুভোথু, বিজয়ারাঘবন, সিদ্ধার্থ ভরতন, ম্যাথু থমাস, বিনয় ফোর্ট ও উন্নিমায়া প্রসাদ
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম: নেটফ্লিক্স
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট
চার পুলিশ কর্মকর্তার ভুল থেকে জটিল রহস্য
সিনেমার গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন আলিনা (পার্বতী থিরুভোথু)। স্বামীকে হারানোর পর ছোট মেয়েকে নিয়ে তাঁর জীবন নতুনভাবে শুরু হয়। প্রশিক্ষণ শেষে নতুন থানায় যোগ দিয়ে পরিচিত হন জ্যেষ্ঠ কনস্টেবল দিব্যার (উন্নিমায়া প্রসাদ) সঙ্গে। অন্যদিকে দাসন (সিদ্ধার্থ ভরতন) ও শ্রীনাথের (ম্যাথু থমাস) জীবনেও চলছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অপেক্ষা।
শুরুতে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ও পুলিশি দায়িত্ব পালনের সাধারণ চিত্র উঠে আসে। তাঁরা সিনেমার প্রচলিত আদর্শ পুলিশ কর্মকর্তাদের মতো নিখুঁত নন। ব্যক্তিগত দুর্বলতা, কর্মক্ষেত্রের দ্বন্দ্ব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধ তাঁদের জীবনকে প্রভাবিত করে।
কিন্তু একপর্যায়ে চারজন এমন একটি ভুল করে বসেন, যার পরিণতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেখান থেকেই গল্পে তৈরি হয় রহস্য, উদ্বেগ ও একের পর এক নতুন জটিলতা।
‘দৃশ্যম’-এর সঙ্গে মিল কোথায়?
‘দৃশ্যম’-এর মতো এই সিনেমাতেও অপরাধ, তদন্ত এবং নিজেদের রক্ষার চেষ্টার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুই সিনেমার গল্প বলার ধরনে পার্থক্য রয়েছে।
‘দৃশ্যম’-এর জর্জকুট্টি ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে পরিস্থিতি সামাল দিতে দক্ষ। বিপরীতে, ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’-এর চরিত্রগুলো পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে অনেক বেশি দুর্বল ও অনভিজ্ঞ। তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্তের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো দক্ষতা সব সময় দেখাতে পারেন না।
সিনেমাটির বড় আকর্ষণ হলো, দর্শককে শুধু অপরাধের রহস্য নয়, চরিত্রগুলোর নৈতিক অবস্থান নিয়েও ভাবতে হয়। কে সঠিক, কে ভুল এবং আইনের সীমা কোথায়—এসব প্রশ্ন গল্পের সঙ্গে সঙ্গে আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তদন্তে নতুন মাত্রা আনেন বিজয়ারাঘবন
গল্পে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা হ্যারিস মিরানের (বিজয়ারাঘবন) প্রবেশের মধ্য দিয়ে। তিনি দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং তদন্তে পারদর্শী একজন কর্মকর্তা। তাঁর উপস্থিতিতে চাপ বাড়তে থাকে বিপাকে পড়া পুলিশ সদস্যদের ওপর।
প্রথম দিকে মিরানকে আদর্শ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবেই মনে হয়। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, তাঁর সিদ্ধান্ত ও নৈতিক অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়ে। ব্যক্তিগত অহং, পদমর্যাদা এবং অধস্তনদের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁর বিচারবোধকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এখানেই সিনেমাটি গতানুগতিক পুলিশি থ্রিলার থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। এখানে শুধু অপরাধীর পরিচয় উদ্ঘাটন নয়, বরং তদন্তকারীদের নিজেদের অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
দীর্ঘ সময়জুড়েও ধরে রাখে উত্তেজনা
প্রায় দুই ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের সিনেমাটি দীর্ঘ হলেও অধিকাংশ সময় দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম। পরিচালক শাহাদ আগের কাজের তুলনায় এখানে নিজের নির্মাণশৈলীতে পরিণত হওয়ার ছাপ রেখেছেন।
চিত্রনাট্যে কিছু জায়গায় গল্প এগিয়ে নিতে সুবিধাজনক পরিস্থিতি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে তদন্তের ধারাবাহিকতা, চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব এবং রহস্যের স্তর উন্মোচন দর্শককে আগ্রহী রাখে।
সিনেমার একটি চরিত্রের লেখা বইও কাহিনির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি কেবল গল্পের উপকরণ নয়, বরং রহস্যের নতুন দিক উন্মোচনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও থানার উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে পরিমিত হাস্যরসও গল্পকে ভারসাম্য দেয়।
পার্বতী ও বিজয়ারাঘবনের অভিনয়
আলিনা চরিত্রে পার্বতী থিরুভোথু সিনেমার আবেগী দিককে শক্তিশালী করেছেন। নতুন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর অনভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার চেষ্টা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে হ্যারিস মিরান চরিত্রে বিজয়ারাঘবন পর্দায় এমন এক তদন্তকারীর উপস্থিতি তৈরি করেছেন, যাঁর দক্ষতা ও দৃঢ়তা গল্পে বাড়তি উত্তেজনা যোগ করে। অন্য অভিনয়শিল্পীরাও নিজেদের চরিত্রের মাধ্যমে কাহিনির জটিলতা ও বাস্তবতাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছেন।
তাহলে কি ‘দৃশ্যম’-এর চেয়েও ভালো?
মালয়ালম ক্রাইম-থ্রিলারের ভক্তদের জন্য ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ নিঃসন্দেহে আগ্রহ জাগানোর মতো একটি সিনেমা। নৈতিক দ্বন্দ্ব, পুলিশি তদন্ত, চরিত্রের দুর্বলতা এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সমন্বয়ে এটি নিজস্ব গল্প বলার ধরন তৈরি করেছে।
তবে ‘দৃশ্যম’-এর সঙ্গে তুলনা পুরোপুরি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। ‘দৃশ্যম’-এর পরিকল্পনানির্ভর রহস্য আর এই সিনেমার নৈতিক জটিলতা এক ধরনের অভিজ্ঞতা দেয় না। তাই কোনটি ভালো, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দর্শকের।
যাঁরা গতানুগতিক গল্পের বাইরে একটু ভিন্ন ধরনের পুলিশি থ্রিলার দেখতে চান, তাঁদের তালিকায় রাখতে পারেন ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’। রহস্যের পাশাপাশি চরিত্রের সিদ্ধান্ত ও নৈতিক দ্বন্দ্ব যাঁদের আকর্ষণ করে, তাঁদের জন্য সিনেমাটি হতে পারে উপভোগ্য পছন্দ।
