কৃষি ডেস্ক
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের বালুচর ও অগভীর পানিতে ছড়িয়ে থাকা সামুদ্রিক শৈবাল (সিউইড) উপকূলীয় মানুষের বিকল্প আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। শৈবাল চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায়ও এর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
মৎস্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প কুয়াকাটা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় শৈবাল চাষের সম্ভাবনা নিয়ে এক বছরব্যাপী গবেষণা করেছে। গবেষণায় উপকূলীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ, সংগৃহীত শৈবালের পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ, মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরির সম্ভাবনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে শৈবালের ভূমিকা নিয়ে কাজ করা হয়।
কুয়াকাটায় বহুদিনের সম্ভাবনা
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পটুয়াখালীর খেপুপাড়া নদী উপকেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের গঙ্গামতী খাল, হাজীপুর ফেরিঘাট, আন্ধারমানিক নদীর তীরবর্তী বালিয়াতলী ও চরিপাড়া এলাকা ঘুরে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক শৈবালের সন্ধান পেয়েছিলেন।
তাঁর সংগ্রহ করা নমুনায় মূলত হাইপনিয়া (Hypnea) গণের বিভিন্ন প্রজাতির শৈবাল শনাক্ত করা হয়েছিল। এগুলো সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি জোয়ার-ভাটার এলাকায় পানির নিচে জন্মায়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শৈবালের পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে চাষের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হয়েছে। স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করে র্যাফট ও লংলাইন পদ্ধতিতে চাষের বিষয়টি বিশেষভাবে দেখা হয়েছে।
কম খরচে চাষ করা যেতে পারে যে শৈবাল
গবেষণায় Ulva lactuca, যা সাধারণভাবে ‘সি লেটুস’ নামে পরিচিত, সম্ভাবনাময় একটি প্রজাতি হিসেবে উঠে এসেছে। তুলনামূলক কম খরচে কম লবণাক্ত ও ঘোলা পানিতেও এটি চাষ করা সম্ভব।
অনুকূল পরিবেশে এই শৈবাল মাসে দুইবার পর্যন্ত সংগ্রহ করা যেতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে স্বল্প সময়ে উৎপাদন থেকে আয় করার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে উপকূলীয় মানুষের জন্য।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল আলম বলেন, পটুয়াখালীর উপকূলীয় অবস্থান সামুদ্রিক শৈবাল চাষের জন্য যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচের কারণে এ চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শৈবালের পুষ্টিগুণ বিবেচনায় এটিকে বিকল্প খাদ্য উৎস হিসেবেও ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে।
শৈবাল থেকে তৈরি হচ্ছে নানা পণ্য
গবেষকেরা সংগৃহীত শৈবাল ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরির পরীক্ষাও চালিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে নোরি শিট, বিস্কুট, জেলি, চিপস, সসেজ, আইসক্রিম, জিলাপি, রসগোল্লা, সাবান ও হারবাল বডি স্ক্রাব।
তবে খাদ্য হিসেবে শৈবাল ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। এ জন্য গবেষণায় মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষা, ভারী ধাতুর উপস্থিতি, লিপিড অক্সিডেশন এবং পুষ্টিমান বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
দুমকি লুথেরান হেলথ কেয়ারের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মন্টারিয়া জান্নাত বলেন, সামুদ্রিক শৈবালে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ থাকতে পারে। তবে খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের আগে যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুষ্টিবিষয়ক নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
উপকূলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ বাড়ানো গেলে উপকূলীয় মানুষের জন্য মাছ ধরার পাশাপাশি নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের যুক্ত করে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে একটি নতুন উপকূলীয় শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
পটুয়াখালী ও কুয়াকাটার মতো উপকূলীয় অঞ্চলে শৈবালের প্রাকৃতিক উপস্থিতি ইতিমধ্যেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। এখন প্রয়োজন গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা।

