দেশে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধানের চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে এই ধানের চাষ শুরু করেছেন কৃষকেরা। ফলন ও বাজারমূল্য ভালো হলে আগামীতে চাষের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
কালো ধানের চালের বিশেষ রং, পুষ্টিগুণ ও বাজার সম্ভাবনার কারণে এটি নিয়ে আশাবাদী কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা। তবে বাণিজ্যিকভাবে চাষ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ফলন, উৎপাদন খরচ ও বাজারজাতকরণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দুর্গাপুরে পরীক্ষামূলক চাষ
রাজশাহী অঞ্চলে একসময় ‘শনি’ ও ‘কালিরায়’ নামে কালো রঙের দুটি দেশীয় ধানের জাতের চাষ হতো। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও পাবনা অঞ্চলে এসব ধানের আবাদ ছিল। তবে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধানের বিস্তারের কারণে শনি ধানের চাষ প্রায় হারিয়ে গেছে। নওগাঁ ও পাবনার কিছু বিলাঞ্চলে এখনো কালিরায় ধানের চাষ টিকে আছে।
এবার নতুন করে উচ্চ ফলনশীল ব্ল্যাক রাইসের চাষ জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ।
দুর্গাপুরের দেবীপুর গ্রামের উদ্যোক্তা সোহান আলী শালঘরিয়া মাঠের ১৬ কাঠা জমিতে এবং মাড়িয়া ইউনিয়নের পালি গ্রামের কৃষক আবু তালেব আড়াই বিঘা জমিতে কালো ধান চাষ করছেন। নতুন এই ধানের ফলন, উৎপাদন খরচ ও বাজারজাতকরণের সম্ভাবনা যাচাইয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
কৃষক আবু তালেব জানান, কৃষি বিভাগের উৎসাহ ও সহায়তায় তিনি প্রথমবারের মতো আড়াই বিঘা জমিতে কালো ধানের আবাদ করেছেন। ফলন ভালো হলে এবং বাজারে উপযুক্ত দাম পাওয়া গেলে আগামীতে আরও বেশি জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
কালো ধানের দাম কত?
দুর্গাপুরের দুই কৃষকের আশা, প্রতি বিঘায় ১৬ থেকে ১৮ মণ কালো ধান পাওয়া যেতে পারে। তাঁদের প্রত্যাশা, বাজারে প্রতি মণ কালো ধান প্রায় ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি করতে পারবেন তাঁরা।
অন্যদিকে, প্রচলিত ধানের প্রতি মণের দাম বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা বলে জানিয়েছেন তাঁরা। সেই হিসাবে কালো ধানের সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য তুলনামূলক বেশি হতে পারে। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘায় ৬৪ হাজার থেকে ৭২ হাজার টাকার ধান বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি তাঁদের প্রত্যাশিত হিসাব; প্রকৃত আয় নির্ভর করবে উৎপাদন, বিক্রয়মূল্য ও বাজারের চাহিদার ওপর।
কৃষকদের দাবি, কালো ধান চাষে প্রচলিত ধানের মতোই খরচ হয়। ইতিমধ্যে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কৃষিপ্রতিষ্ঠান এই চাল কেনার বিষয়ে যোগাযোগ করছে।
ব্ল্যাক রাইসের গুণাগুণ কী?
ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধানের চালের গাঢ় কালো কিংবা বেগুনি রঙের পেছনে রয়েছে অ্যান্থোসায়ানিন নামের প্রাকৃতিক রঞ্জক উপাদান। এ চালে খাদ্যআঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। বিশেষ রং ও পুষ্টিগুণের কারণে বাজারে এ চালের চাহিদা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে শুধু পুষ্টিগুণের কারণে চালের বাজারমূল্য বেশি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ক্রেতাদের চাহিদা, চালের মান, উৎপাদনের পরিমাণ এবং সরবরাহব্যবস্থাও এর বাণিজ্যিক সাফল্য নির্ধারণ করবে।
চাষ সম্প্রসারণ নিয়ে যা বলছে কৃষি বিভাগ
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাহানা পারভীন লাবণী জানান, এলাকায় প্রথমবারের মতো কালো ধানের চাষ কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। নতুন ও সম্ভাবনাময় ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও তদারকি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফলন, উৎপাদন ব্যয় ও বাজার সম্ভাবনা মূল্যায়নের পর ভবিষ্যতে এ ধরনের ধানের চাষ সম্প্রসারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা আরও জানান, দেশের চেইন শপ ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে কালো চালের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উপযুক্ত বাজার তৈরি হলে এ ধানের চাষ কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
