সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় দেশটির কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ। আটক, বিচার ও দণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে কনস্যুলার সূত্র। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে তাঁদের বিরুদ্ধে মসজিদে অশালীন কাজের অভিযোগ আনা হয়। তবে মামলার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

ভিয়েনা কনভেনশন কী বলে?

বিদেশে কোনো নাগরিক আটক হলে তাঁর নিজ দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ ও কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সুরক্ষার অংশ। এ বিষয়ে ১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিধান রয়েছে।

এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে তিনি কনস্যুলার সহায়তা চাইতে পারেন। তিনি অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষকে বিলম্ব না করে তাঁর দেশের কনস্যুলার দপ্তরকে অবহিত করতে হয়। আটক ব্যক্তিকে কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কেও জানাতে হয়।

তবে দূতাবাসকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা এবং আটক ব্যক্তির অনুরোধের পর অবহিত করার বিধানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই মামলায় আটক ব্যক্তিদের কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না, তাঁরা দূতাবাসের সহায়তা চেয়েছিলেন কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী হতে পারে। তবে এ ধরনের ঘটনায় দূতাবাসকে অবহিত করা এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদ এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরীফুল হাসান মনে করেন, আটক, বিচার ও দণ্ড কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাসকে অবহিত না করার বিষয়টি গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁদের মতে, কনস্যুলার সহায়তার অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তবে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি এবং দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো থাকলেও এ ঘটনায় কী ঘটেছে, তা জানতে সৌদি আরবের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে আনা হবে কবে?

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার পরই এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, মরদেহ হস্তান্তর এবং দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা চলছে বলে জানা গেছে।

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন হলো—বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁদের কনস্যুলার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না এবং বাংলাদেশকে না জানানোর পেছনে কী কারণ ছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version