নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর হিন্দুত্ববাদী ভারতের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে গত ৫ আগস্ট দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ‘হাসিনা ইস্যুতে’ ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে দিল্লি এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
দিল্লি সফরের বিষয়ে ঢাকার অবস্থানকে অনেকে সরকারের দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে নির্বাচিত সরকার নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে বলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নেওয়ার পক্ষে দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন মহল থেকে প্রচারণা চলছে। তবে ঢাকা দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে নির্বাচিত সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, ঋণের চাপ এবং নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার ১৮০ দিনের কার্যক্রম তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ছয় মাসের বিভিন্ন অর্জন তুলে ধরা হলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী কি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে?
শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন—এমন অভিযোগের মধ্যে জামায়াতের পক্ষ থেকে সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে ‘১০০ শতাংশ ব্যর্থতা’ হিসেবে মূল্যায়ন করা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের ব্যর্থতার এমন মূল্যায়ন পরোক্ষভাবে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যকে শক্তিশালী করছে কি না, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, দেড় দশকেরও বেশি সময়ের শাসনব্যবস্থার পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তনের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের মাত্র ছয় মাসের কর্মকাণ্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত? বিএনপি সরকার ছয় মাসে ব্যর্থ হলে, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতও কি এই সময়ে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পেরেছে?
বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
গত ছয় মাসে সংসদ ও সংসদের বাইরে জনগণের পক্ষ থেকে জামায়াত কি কোনো উল্লেখযোগ্য ও গঠনমূলক দাবি উত্থাপন করেছে—এমন প্রশ্নও উঠছে। একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের কাজ হলো সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা, পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। কিন্তু জামায়াতের রাজনীতিতে বর্তমানে ‘সংস্কার ও গণভোট’ ইস্যুটিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সংস্কার ও গণভোটের যে বিষয়গুলো সামনে এসেছিল, সেগুলোকে কেন্দ্র করে জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মসূচিও জোরালো হয়েছে। তবে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ও জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে এসব ইস্যুর কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
দেশের অর্থনীতিতেও রয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার। প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগও আসছে না। একই সময়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং চীন অর্থায়িত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের মতো প্রকল্প নিয়েও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নানা আলোচনা চলছে।
এ অবস্থায় বিরোধী দলের দায়িত্ব হওয়া উচিত সরকারের কাছে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ দাবি করা। কিন্তু জামায়াত বিরোধী দল হিসেবে এই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারছে, সেটিও প্রশ্নের মুখে।
ছয় মাসের মূল্যায়নে জামায়াতের অভিযোগ
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রভাব, দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বেকারত্বের মতো সমস্যাগুলো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের পক্ষ থেকে কী ধরনের বিকল্প পরিকল্পনা বা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে জামায়াত দাবি করেছে, বিএনপি সরকার ছয় মাসে আটটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে বলেন, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অনীহা, ভয়াবহ গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনার অভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নিত্যপণ্যের দামের চাপ, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ, গুম প্রতিরোধ আইনের বাস্তবায়নে উদ্বেগজনক ঘাটতি এবং পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে।
জামায়াতের মতে, এসব বিষয় বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা, অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সরকার এখনও অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারেনি—এটি বাস্তবতা। তবে পররাষ্ট্রনীতিতে বিশেষ করে শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকার সাম্প্রতিক অবস্থানকে জামায়াত কীভাবে মূল্যায়ন করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
‘হাসিনা ইস্যুতে’ সরকারের অবস্থান
শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে দেওয়া বক্তব্যের পর ঢাকার প্রতিবাদ এবং ভারতকে কূটনৈতিকভাবে চাপ দেওয়ার উদ্যোগকে কেউ কেউ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের গবেষকদের মতে, দিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক চাপ তৈরির ক্ষেত্রে ঢাকার সাম্প্রতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক শহীদুজ্জামানও জামায়াতের বর্তমান বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, জামায়াত বর্তমানে অনেকটা আওয়ামী লীগের সুরে কথা বলছে।
সরকার যখন পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এনে দিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, তখন শেখ হাসিনার বক্তব্যকে সামনে রেখে সরকারের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের প্রশ্ন তোলার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
দিল্লির চাপের মুখে বিরোধী দলের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের দায়িত্ব সরকারকে অন্ধভাবে সমর্থন করা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থের জায়গায় সরকারকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি ভুল থাকলে তা তুলে ধরা।
জামায়াত একটি সংগঠিত রাজনৈতিক দল। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলামের মতো শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যের প্রভাব দলটির তৃণমূল পর্যায়েও পড়ে। তাই জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে দলটির অবস্থান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজন রয়েছে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু এর পরিবর্তে সরকারবিরোধী ধারাবাহিক কর্মসূচি এবং সরকারের ছয় মাসকে ‘১০০ শতাংশ ব্যর্থ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা কতটা সময়োপযোগী, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট লংমার্চের কর্মসূচি রয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জুলাইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ঐক্য এবং জাতীয় স্বার্থে অভিন্ন অবস্থানের প্রত্যাশা রয়েছে। এমন সময়ে একদিকে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ, অন্যদিকে রাস্তায় ধারাবাহিক কর্মসূচি—এই কৌশল রাজনৈতিকভাবে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমের কঠোর সমালোচনা করা কি বিরোধী দলের দায়িত্বের অংশ, নাকি বর্তমান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরও কৌশলী ও গঠনমূলক ভূমিকা প্রয়োজন? বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, শেখ হাসিনা ইস্যু, অর্থনৈতিক সংকট ও জাতীয় স্বার্থের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিরোধী দলের অবস্থান জনগণ কীভাবে মূল্যায়ন করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
