আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক | দৈনিক রিপোর্ট
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে নয়াদিল্লিতে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে গত কয়েক দিনের বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতায় স্পষ্ট হয়েছে, সম্ভাব্য এই সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ভারত সরকার।
কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঠিক না হলেও আগস্টের শেষ সপ্তাহকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দুই দেশের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির সুযোগ হিসেবে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে দেখছে নয়াদিল্লি।
ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে ব্রিকসের বিশেষ অধিবেশনেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, সফর নিয়ে অগ্রগতি হলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। তবে নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক তৎপরতায় কূটনৈতিক মহল মনে করছে, বিষয়টি শুধু আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং দুই দেশের সম্পর্কের জমে থাকা দূরত্ব কমানোর একটি সুযোগ হিসেবেও সফরটি বিবেচনা করছে মোদি সরকার।
যেসব ইস্যুতে আলোচনা চায় ভারত
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ভারত। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনা এবং গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের মতো বিষয়।
নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, এসব বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রয়েছে। তবে ভারতের অবস্থান হচ্ছে, যে কোনো সিদ্ধান্ত দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং কোনো ধরনের চাপের ভিত্তিতে নয়।
ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ প্রয়োজন জানালে জ্বালানি ও অন্যান্য সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারণের বিষয়েও ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে পারে ভারত।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভারতের অবস্থান
সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যুগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ।
কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, এ বিষয়ে ভারত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয়টির আইনগত দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরে এই ইস্যু কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়েও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী ঢাকা
জ্বালানি সহযোগিতাও সম্ভাব্য সফরের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ ভারতকে পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। এরই মধ্যে দুই দেশের মধ্যে ডিজেল সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনার সময় বাংলাদেশের চাহিদা, ভারতের পরিশোধন সক্ষমতা এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হবে।
দিল্লির প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের সময় বাংলাদেশের এ দাবিকে তুলনামূলক ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হতে পারে।
ক্রিকেট সম্পর্কেও বরফ গলানোর উদ্যোগ
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্কেও। এবার সেই অস্বস্তি দূর করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে ভারত।
বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের বিভিন্ন ভারতীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, দুই দেশের ক্রিকেটীয় যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, ক্রীড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগও বাড়তে পারে।
নতুন অধ্যায়ের সুযোগ দেখছে নয়াদিল্লি
নয়াদিল্লির একটি অংশের কূটনীতিকদের মতে, তারেক রহমানের দিল্লি সফর সফল হলে রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জনসম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন গতি আসতে পারে।
ভারত মনে করছে, দুই দেশের সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকলেও যোগাযোগের পথ বন্ধ রাখা উচিত নয়। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেই অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহী মোদি সরকার।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে ঘিরে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও সাম্প্রতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, সম্ভাব্য এই সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রস্তুতি নিচ্ছে নয়াদিল্লি। দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে নিতে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে ভারত।

