
দৈনিক রিপোর্ট ডেস্ক:
বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই ময়মনসিংহে ডেঙ্গু সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত মোট ৩৮২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই ভর্তি হয়েছেন ২৫৬ জন, যা চলতি বছরের মোট রোগীর বড় একটি অংশ। একই সময়ে ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও জুলাইয়ে হঠাৎ রোগী বেড়ে যাওয়ায় গত ২ জুলাই থেকে ২০ শয্যার একটি পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়। তবে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৫১ জন। শয্যা সংকটের কারণে কয়েকজন রোগীকে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো পাঁচজনের মধ্যে একজন ফেব্রুয়ারিতে, তিনজন জুন মাসে এবং একজন জুলাইয়ে মারা যান।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, সাধারণত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গুর মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। গত বছরও একই ধারা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৭৬ জন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী পাঁচ মাস অর্থাৎ আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২২৭ জনে, আর মৃত্যু হয় ২৮ জনের।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৭টা পর্যন্ত ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ৫১ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১৯ জন এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১৭ জন।
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নগরীর ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নগরীতে মাত্র চারজন আক্রান্ত হলেও জুনে এ সংখ্যা বেড়ে আটজনে পৌঁছায়। আর ২৪ জুলাই পর্যন্ত নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২ জন। সব মিলিয়ে এ বছর নগর এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৭৮ জন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, আগের বছরের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিন দুই দফা ফগিং, লার্ভিসাইড স্প্রে, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং বাসাবাড়িতে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
নওমহলসহ কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, অনেক নালা-নর্দমায় আবর্জনা জমে থাকায় মশার বংশবিস্তার বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মশার উপদ্রব আগের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটছে। নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে দাবি তাদের।
হাসপাতালের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, চলতি বছরের ভর্তি হওয়া ৩৮২ জন রোগীর মধ্যে ১১৯ জন ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। মোট রোগীর প্রায় ৫৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকার। নওমহল, আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার এবং বাউন্ডারি রোড এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. মাইনউদ্দিন খান জানান, বর্ষা মৌসুমে রোগী বৃদ্ধির সম্ভাবনা মাথায় রেখেই আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসামগ্রী পর্যাপ্ত রয়েছে।
অন্যদিকে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুলাই পর্যন্ত জেলার ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে সেখানে আটজন ভর্তি রয়েছেন।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. ফয়সল আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শুধু জেলার নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে এখানকার রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।