নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো বন্ধুকে বিদায় জানাতে আট বছর বয়সী জাইমার আঁকা একটি ছবি ও ছোট্ট চিঠি এখন পরিবারের কাছে স্মৃতি হয়ে আছে। ছবিতে দুই বান্ধবীকে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। নিচে শিশুসুলভ হাতের লেখায় লেখা—‘প্রিয় হিয়া, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আবার দেখা হবে।’
জাইমা তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু খায়রুন তাসনিম হিয়ার জন্য ছবিটি আঁকে। তবে ছবি আঁকার সময় হিয়া আর তা দেখতে পারেনি। ডেঙ্গুতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে মারা যায় আট বছরের হিয়া। পরে জাইমার আঁকা ছবিসহ চিঠিটি হিয়ার কফিনের সঙ্গে রাখা হয়।
আলাদা স্কুল, বদলায়নি বন্ধুত্ব
হিয়া ও জাইমা দুজনেরই বয়স আট বছর। প্লে-গ্রুপ থেকে কিন্ডারগার্টেন পর্যন্ত তারা একই স্কুলে পড়েছে। সে সময় তাদের বাড়িও ছিল পাশাপাশি।
প্রথম শ্রেণিতে ওঠার পর দুজন আলাদা স্কুলে ভর্তি হয়। হিয়া পড়ত মণিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে, আর জাইমা পড়ত ওয়াইডব্লিউসিএতে। পরে দুই পরিবারের বাসস্থানও পরিবর্তন হয়। তবে এতে তাদের বন্ধুত্বে কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি।
নিয়মিত ভিডিও কলে কথা বলত তারা। জন্মদিনসহ বিভিন্ন পারিবারিক আয়োজনেও দুই পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সময় কাটাতেন। দেখা হলে একে অপরকে উপহার দেওয়া, ছবি আঁকা—এসব ছিল তাদের বন্ধুত্বের অংশ।
মা-মেয়ে দুজনের ডেঙ্গু
হিয়ার বাবা মো. খোকন মিয়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রকৌশল বিভাগে বৈজ্ঞানিক সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের একমাত্র সন্তান ছিল হিয়া।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, হিয়ার মা শাহিনা আক্তার ২৫ আগস্ট ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর রাজধানীর আগারগাঁওয়ের লায়ন্স আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে ২৮ আগস্ট হিয়ারও ডেঙ্গু ধরা পড়ে এবং তাকেও একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অবস্থার অবনতি হলে ২৯ আগস্ট হিয়াকে ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়।
হিয়ার মা শাহিনা আক্তার বলেন, মেয়ের চিকিৎসায় কোনো অবহেলা করেননি তিনি। অসুস্থ হওয়ার সময় হিয়ার বমি হচ্ছিল, পানি পান করতেও কষ্ট হচ্ছিল এবং একপর্যায়ে খিঁচুনি শুরু হয়।
মেয়ের মৃত্যুতে শোকাহত শাহিনা বলেন, তিনি চাকরি না করে মেয়েকে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হিয়া ছিল তাঁদের একমাত্র সন্তান।
‘বাড়ি যেতে চেয়েছিল হিয়া’

হিয়াকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও সে নিজের অসুস্থতার মাত্রা বুঝতে পারেনি বলে জানান বাবা খোকন মিয়া।
তিনি বলেন, লায়ন্স হাসপাতাল থেকে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়ার সময় হিয়া অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে দিতে বলেছিল। সে বাড়ি যেতে চেয়েছিল এবং তখন দিন না রাত, সেটিও জানতে চাইছিল।
আইসিইউতে নেওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে আর বেশি কথা বলার সুযোগ হয়নি বলে জানান তিনি।
বন্ধুর জন্য জাইমার শেষ চিঠি
হিয়ার মৃত্যুর আগে জাইমা তাঁর জন্য একটি ছবি আঁকে। সঙ্গে ছোট্ট একটি চিঠিও লেখে। সেখানে দুই বন্ধুকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাত ধরে থাকতে দেখা যায়।
চিঠিতে জাইমা লিখেছে, ‘প্রিয় হিয়া, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আবার দেখা হবে।’
হিয়ার পরিবার জানিয়েছে, এই ছবিটি এখন তাদের কাছে মেয়ের ছোট্ট জীবনের একটি আবেগঘন স্মৃতি।
হিয়ার বাবা খোকন মিয়ার প্রত্যাশা, ডেঙ্গুতে যেন আর কোনো শিশুকে এভাবে হারাতে না হয়। তিনি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধন ও প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

