ঢাকা, ২৩ আগস্ট ২০২৬: ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে পায়ের স্নায়ু ও রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে পায়ের অনুভূতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষত শুকাতে দেরি হয়। ফলে ছোট ফোসকা, কাটা বা ঘা-ও গুরুতর সংক্রমণে রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসে পায়ে কোনো ক্ষত হলে শুরুতেই চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। কারণ সময়মতো ব্যবস্থা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই বড় ধরনের জটিলতা এবং অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন এড়ানো সম্ভব।
অস্ত্রোপচার মানেই পা হারানো নয়
ডায়াবেটিক ফুটের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের উদ্দেশ্য সবসময় পা কেটে ফেলা নয়। বরং সংক্রমিত বা মৃত টিস্যু অপসারণ, পুঁজ বের করা, ক্ষত শুকাতে সহায়তা করা এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে অস্ত্রোপচার করা হতে পারে।
ক্ষতের অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকেরা মৃত বা সংক্রমিত টিস্যু অপসারণ করতে পারেন। কোথাও পুঁজ জমলে তা বের করার প্রয়োজন হতে পারে। গুরুতর ক্ষতের ক্ষেত্রে সুস্থ ত্বক দিয়ে ক্ষত ঢেকে দেওয়ার মতো চিকিৎসাও করা হতে পারে। পায়ে রক্ত চলাচল কমে গেলে রক্তপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া প্রয়োজন হতে পারে।
অঙ্গচ্ছেদ সাধারণত গুরুতর অবস্থায় বিবেচনা করা হয়, বিশেষ করে সংক্রমণ বা মৃত টিস্যু রোগীর জীবনঝুঁকি তৈরি করলে।
চিকিৎসার আগে যেসব বিষয় দেখা হয়
অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন আছে কি না তা নির্ধারণের আগে চিকিৎসকেরা সংক্রমণের মাত্রা, পায়ের রক্ত চলাচল এবং ক্ষত কতটা ভালোভাবে শুকাচ্ছে—এসব বিষয় মূল্যায়ন করেন।
অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হতে সময় রোগীভেদে ভিন্ন হয়। কারও কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে, আবার কারও কয়েক মাসও প্রয়োজন হতে পারে। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, রক্ত চলাচল এবং ক্ষতের পরিচর্যার ওপর সুস্থ হওয়ার গতি অনেকটাই নির্ভর করে। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর পুরোপুরি সেরে উঠতে প্রায় চার থেকে ১২ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
অস্ত্রোপচারের পরও যত্ন জরুরি
শুধু অস্ত্রোপচার করলেই চিকিৎসা শেষ নয়। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা, চিকিৎসকের দেওয়া ক্ষত পরিচর্যার নিয়ম মেনে চলা, আক্রান্ত পায়ে অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া এবং নিয়মিত ফলোআপ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুস্থ হওয়ার পর্যায়ে উপযুক্ত জুতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিক্যাল থেরাপিও স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলায় ফিরতে সহায়তা করতে পারে।
প্রতিদিন পা পরীক্ষা করার অভ্যাস করুন
ডায়াবেটিসে পায়ের অনুভূতি কমে যেতে পারে। ফলে কাটা, ফোসকা বা ছোট ঘা হলেও অনেক সময় ব্যথা অনুভূত হয় না। তাই প্রতিদিন পা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
পায়ে লালচে ভাব, ফোলা, চামড়া উঠে যাওয়া, ক্ষত, ঘা বা অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যথা না থাকলেও ক্ষতকে অবহেলা করা ঠিক নয়।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে পা পরীক্ষা করানোও প্রয়োজন। সমস্যা যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসা তত সহজ হয় এবং জটিলতার ঝুঁকি কমে।
ডায়াবেটিক ফুট নিয়ে ভয় পাওয়ার চেয়ে সচেতনতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো চিকিৎসা, প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচার এবং নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। পায়ের যত্ন তাই ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
লেখক: ডা. এম এ করিম, সার্জারি বিশেষজ্ঞ, মার্কস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।
