বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়জীবনের শুরুটা ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম ও ধৈর্যের। ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় থেকে শুরু করে একসময় তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম পরিচিত অভিনেতা। তবে এই পথচলায় অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীত ও থিয়েটারের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর ভালোবাসা।
১৯৯৬ সালে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছাড়াই নাট্যদল আরণ্যক নাট্যদলে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান চঞ্চল চৌধুরী। সে সময় প্রায় ২০০ জনকে প্রাথমিকভাবে ডাকা হলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র আটজন নির্বাচিত হন।
অভিনয়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে চঞ্চল সৎভাবে জানিয়েছিলেন, তাঁর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তবে তিনি গান গাইতে পারেন এবং যা শেখানো হবে, তা করার আগ্রহ রয়েছে—এ কথা জানান। তাঁর সরল উত্তরই হয়তো নির্বাচকদের নজর কেড়েছিল।
এরপর প্রায় এক দশক আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত থেকে মঞ্চের পেছনের বিভিন্ন কাজ ও ছোট চরিত্রে যুক্ত ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ‘জয়জয়ন্তী’ নাটকে অভিনয়ের সুযোগ আসে। নাটকটির হারমোনিয়াম বাদক উপস্থিত না থাকায় অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু তাঁর নাম প্রস্তাব করেন।
সেই নাটকে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় ছিল মাত্র দুই-তিনটি সংলাপের। তবে এতটুকুতেই তিনি খুশি ছিলেন। ধীরে ধীরে ছোট চরিত্র থেকে তাঁর অভিনয়ের পরিধি বাড়তে থাকে।
মামুনুর রশীদের লেখা ও পরিচালনায় ‘সুন্দরী’ ধারাবাহিকেও মাত্র দুটি দৃশ্যে সাংবাদিক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন চঞ্চল। সেখানে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত। পরে এক দৃশ্য থেকে একাধিক দৃশ্যে এবং ছোট চরিত্র থেকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে যাওয়ার পথ তৈরি হয়।
চঞ্চল জানান, টেলিভিশনে কেন্দ্রীয় চরিত্র পেতে তাঁর প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর সময় লেগেছিল। এত দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তিনি অভিনয় ছাড়েননি। থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিয়মিত অনুশীলন ও কাজ করে গেছেন।
২০০৫ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পরিচালনায় একটি বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের পর ব্যাপক পরিচিতি পান চঞ্চল চৌধুরী। বিজ্ঞাপনটিতে মায়ের জন্য মোবাইল ফোন নিয়ে বাড়ি ফেরা এক ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। বিজ্ঞাপনটি প্রচারের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ তাঁকে চিনতে শুরু করেন।
এরপর ‘তালপাতার সেপাই’ ও ‘নিখোঁজ সংবাদ’-এর মতো টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। ধীরে ধীরে নিয়মিত কাজের সুযোগ বাড়তে থাকে।
তবে অভিনয়ের শুরুর দিকে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন না চঞ্চল। চার ভাইবোনের পরিবারে তাঁর বাবা ছিলেন শিক্ষক। চারুকলায় পড়াশোনার সময় নিজের খরচ চালাতে তিনি শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতেন।
সেই টিউশনের টাকা জমিয়েই তিন থেকে চার বছর পর একটি হারমোনিয়াম কিনেছিলেন বলে জানান চঞ্চল।
তিনি বলেন, টিউশনি করে জমানো টাকা দিয়ে হারমোনিয়ামটি কিনেছিলেন। বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল, যা এখনো রয়েছে।
বিজ্ঞাপনে পরিচিতি পাওয়ার পর গিয়াস উদ্দিন সেলিমের টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘এনেছি সূর্যের হাসি’-তে অভিনয় করেন তিনি। এরপর একাধিক নির্মাতার সঙ্গে কাজের সুযোগ পান এবং নিয়মিত অভিনয় করতে থাকেন।
তবে তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে ২০০৯ সালে গিয়াস উদ্দিন সেলিমের চলচ্চিত্র ‘মনপুরা’-য় অভিনয়ের মাধ্যমে। ফারহানা মিলির বিপরীতে অভিনয় করে দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা পান চঞ্চল। সিনেমাটিও দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
‘মনপুরা’ তাঁর অভিনয়জীবনে বিশেষ পরিবর্তন এনেছে উল্লেখ করে চঞ্চল বলেন, এই সিনেমার মাধ্যমে দর্শক তাঁকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন। দর্শকদের ভালোবাসার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।
ছোট চরিত্র থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম, থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা এবং টিউশনের টাকা জমিয়ে কেনা সেই হারমোনিয়ামের স্মৃতি—সব মিলিয়ে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়জীবনের শুরুর গল্পটি তাঁর সংগ্রাম ও অধ্যবসায়েরই প্রতিচ্ছবি।
