বিশাল কোনো বিলবোর্ডে চোখ পড়তেই যদি কোনো তারকার বদলে দেখা যায় এমন এক বিজ্ঞানীর মুখ, যার গবেষণা বদলে দিয়েছে কোটি মানুষের জীবন—চীনের বেশ কয়েকটি শহরে এখন এমন দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে।

বিভিন্ন শহরের বড় বড় পাবলিক স্ক্রিনে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের জায়গা নিয়েছে রকেট বিজ্ঞানী ছিয়ান শুয়েসেন, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী তু ইউইউ এবং কৃষিবিজ্ঞানী ইউয়ান লংপিংয়ের মতো ব্যক্তিদের ছবি। কোথাও তাঁদের নাম ও কাজের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও তুলে ধরা হয়েছে।

বিষয়টি দেখতে খুবই সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যেই রয়েছে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—আমরা আমাদের তরুণদের কাদের অনুসরণ করতে শেখাচ্ছি?

বাংলাদেশে জনপ্রিয়তার সঙ্গে তারকাখ্যাতির সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিলবোর্ড ও বিজ্ঞাপনে যাঁদের মুখ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তাঁদেরই আমরা বেশি চিনি। বারবার চোখের সামনে আসতে আসতে তাঁরাই হয়ে ওঠেন পরিচিত মুখ।

অন্যদিকে, অসাধারণ কাজ করে যাওয়া অনেক মানুষ নিজ নিজ ক্ষেত্রের বাইরে প্রায় অচেনাই থেকে যান।

একজন কিশোর বা কিশোরী কয়েকজন অভিনেতা, সংগীতশিল্পী কিংবা ক্রীড়াবিদের নাম অনায়াসে বলতে পারে। কিন্তু প্রিয় কোনো বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর নাম জানতে চাইলে হয়তো একটু ভেবে নিতে হবে।

এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে বিজ্ঞানীরা কম আকর্ষণীয়। বরং তাঁদের আমরা আমাদের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ করে তুলি না।

দৃশ্যমানতাও তৈরি করে স্বপ্ন

বিলবোর্ডে তারকাদের রাখা হয় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। কিন্তু দৃষ্টি কেবল মনোযোগই তৈরি করে না, মানুষের আকাঙ্ক্ষাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

যাঁদের আমরা বারবার সম্মানিত হতে দেখি, সাফল্যের সঙ্গে তাঁদের নাম ও মুখও তত বেশি জুড়ে যায়। ফলে সাফল্যের সংজ্ঞা তৈরিতেও তাঁদের উপস্থিতির প্রভাব পড়ে।

একবার কল্পনা করা যাক, ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কোনো বাংলাদেশি গবেষকের ছবি দেখা যাচ্ছে। পাশে কয়েক লাইনে লেখা রয়েছে—তিনি কী আবিষ্কার করেছেন, তাঁর গবেষণায় কী পরিবর্তন এসেছে।

কল্পনা করা যাক, স্কুলে বিজ্ঞানীদের এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, যেন তাঁরা পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পরিচিত মুখ। তাঁদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাঁদের কাজ নিয়ে গর্ব করা হচ্ছে, তাঁদের জীবনও তরুণদের অনুপ্রাণিত করছে।

তারকাদের জায়গা কমানোর কথা নয়

এর অর্থ অভিনেতা, সংগীতশিল্পী বা ক্রীড়াবিদদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া নয়। বিনোদন ও খেলাধুলার মানুষের সমাজে নিজস্ব জায়গা আছে এবং থাকবে।

কিন্তু একটি সমাজের আদর্শ মানুষের তালিকা শুধু বিনোদন বা জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। একজন বিজ্ঞানী, গবেষক, উদ্ভাবক কিংবা সমস্যার সমাধানকারীও একইভাবে অনুসরণীয় হতে পারেন।

চীনের উদ্যোগটি অন্তত সেই সম্ভাবনাটাই সামনে এনেছে। সেখানে বিজ্ঞানীদের এমন দৃশ্যমানতা দেওয়া হচ্ছে, যা তাঁদের এক অর্থে জনপরিচিত তারকায় পরিণত করছে। এমনকি মানুষ বিলবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে।

বাংলাদেশ যদি চায় আগামী প্রজন্ম নতুন কিছু আবিষ্কার করুক, নতুন কিছু তৈরি করুক কিংবা কঠিন কোনো সমস্যার সমাধান করুক, তাহলে তাদের সামনে সেই মানুষগুলোকেও নিয়ে আসতে হবে, যারা ঠিক এই কাজগুলোই করে চলেছেন।

হয়তো সময় এসেছে, আলোটা একটু অন্য দিকেও ঘোরানোর।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version