চারঘাট (রাজশাহী)
গৃহহীন মানুষের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে নির্মিত রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো এখন নানা সংকটে জর্জরিত। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও চালের টিন ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকছে, কোথাও ভেঙে গেছে দরজা-জানালা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদক, বহিরাগতদের আনাগোনা, চুরি-ছিনতাই এবং বরাদ্দের ঘর বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ।
এ পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে। কেউ কেউ শেষ সম্বল হিসেবে পাওয়া ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
উপজেলা নাগরিক কমিটি ও মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্প যে উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল, যথাযথ দেখভালের অভাবে তা ব্যাহত হচ্ছে। গৃহহীন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে সুরক্ষাহীনতার মধ্যে পড়েছেন।
৮৫০টির মতো ঘর, সংস্কারের অভাবে বেহাল
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চারঘাট পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়নে কাঁচা-পাকা মিলিয়ে আশ্রয়ণের প্রায় ৮৫০টি ঘর রয়েছে। এর মধ্যে বড় দুটি আবাসন হলো ২০০৪ সালে নির্মিত ১৪০ ঘরের হলিদাগাছী-১ এবং ২০০৯ সালে নির্মিত ২৮০ ঘরের হলিদাগাছী-২।
দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় আবাসন দুটির অনেক অংশ ঝোপ-জঙ্গলে ঢেকে গেছে। বসবাসকারীরা বলছেন, ছোটখাটো মেরামতও নিয়মিত না হওয়ায় ঘরের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
হলিদাগাছী-১-এর বাসিন্দা মুকলেব আলী বলেন, চালের টিন ফুটো হয়ে প্রতিনিয়ত পানি পড়ে। নানা উপায়ে পানি আটকানোর চেষ্টা করেও লাভ হচ্ছে না। অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ না থাকায় এই কষ্টের মধ্যেই থাকতে হচ্ছে।
আবাসনের সভাপতি আব্দুল মান্নান জানান, ১৪০টি ঘরের প্রায় সবকটিতেই কমবেশি পানি পড়ে। সংস্কারের আবেদন করেও কাজ না হওয়ায় ইতোমধ্যে ৩৫টি পরিবার আবাসন ছেড়ে চলে গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের পরও মেরামত হয়নি ১২০ ঘর
হলিদাগাছী-২ আবাসনের সভাপতি জলি বেগম বলেন, সেখানে দুটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো এখনো মেরামত করা হয়নি। তাঁর দাবি, প্রায় ১২০টি ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ কারণে ৪৫টি পরিবার ঘর ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
এর ফলে ফাঁকা হয়ে যাওয়া ঘরগুলোকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।
বরাদ্দের ঘর বিক্রি ও ভাড়ার অভিযোগ
বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, পরিবারগুলো অন্যত্র চলে যাওয়ার সুযোগে আশ্রয়ণের ঘর নিয়ে একটি অবৈধ বাণিজ্য তৈরি হয়েছে। হলিদাগাছী-২ আবাসনের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম স্বপনের বিরুদ্ধে ঘর বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
শিখা খাতুন নামে এক বাসিন্দার অভিযোগ, অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার জন্য তিনি স্বামীর সঙ্গে কিছুদিন ঢাকায় ছিলেন। পরে সন্তান মারা যাওয়ার পর আবাসনে ফিরে এসে জানতে পারেন, তাঁর নামে বরাদ্দ করা ঘরটি ৩০ হাজার টাকায় অন্য একজনের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
তবে শফিকুল ইসলাম স্বপন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ঘরটি খালি থাকায় নিয়ম মেনে অন্য একটি পরিবারকে সেখানে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
মাদক নিয়ে আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতায় নারী-শিক্ষার্থীরা
আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে মাদকের অভিযোগ। বাসিন্দাদের দাবি, নিয়মিত বহিরাগত মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা রয়েছে। এতে নারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। পাশাপাশি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
হলিদাগাছী-২-এর ১৭ নম্বর ব্যারাকের ১০ নম্বর ঘরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মিঠু, তাঁর স্ত্রী আশা বেগম এবং ৮ নম্বর ব্যারাকের জিনারুলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির অভিযোগে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
বাসিন্দাদের দাবি, গত ছয় মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে পাঁচবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
ফারজিনা বেগম নামে এক বাসিন্দা বলেন, মেয়েরা বাইরে যেতে ভয় পায়। প্রতিবাদ করলে হেনস্তার শিকার হতে হয়। তাঁর দাবি, পরিস্থিতির কারণে অন্তত ২০টি পরিবার আবাসন ছেড়ে চলে গেছে।
তবে মোহাম্মদ মিঠু অভিযোগ অস্বীকার করে একে অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন।
রাস্তা না থাকায় দুর্ভোগ
শুধু ঘরের অবস্থা বা মাদক নয়, কিছু আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাতায়াতের সমস্যাও প্রকট। হুজারপাড়া ও নিমপাড়া আবাসনে সরকারি রাস্তা না থাকায় বাসিন্দাদের স্থানীয় ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এ নিয়ে প্রায়ই বিরোধ দেখা দেয়।
হুজারপাড়া আবাসনের বাসিন্দা উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, তিনি ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু রাস্তা না থাকায় ভ্যান বাড়িতে আনা কিংবা চার্জ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাঁর দাবি, ঘর বরাদ্দের সময় এক মাসের মধ্যে রাস্তা করে দেওয়ার কথা বলা হলেও বছরের পর বছরেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।
সংস্কারের জন্য সরকারি বরাদ্দ নেই: প্রকল্প কর্মকর্তা
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফরহাদ লতিফ বলেন, ঘর হস্তান্তরের পর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব উপকারভোগীদের নিজেদের। ঘর মেরামতের জন্য তাঁর দপ্তরে কোনো সরকারি বরাদ্দ আসে না।
তবে তিনি বলেন, প্রকল্পগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত।
চারঘাট মডেল থানার ওসি মাহাবুবুর রহমান বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতে মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে পুলিশ নজরদারি করছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো পুলিশ সদস্য মাদক কারবারিদের সহায়তা করছেন—এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, তিনি নিজে আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করে জরাজীর্ণ ঘর এবং অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত আবাসনের বিষয়টি দেখেছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের দাবি, শুধু নতুন ঘর নির্মাণ নয়, পুরোনো ঘরের নিয়মিত সংস্কার, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং যাতায়াতের রাস্তার ব্যবস্থা করা জরুরি। তা না হলে গৃহহীনদের জন্য তৈরি এসব প্রকল্পই একসময় নতুন দুর্ভোগের কেন্দ্রে পরিণত হবে।
