চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ, বরফ থেকে পানি সংগ্রহ এবং মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণের পরিকল্পনা ঘিরে নতুন প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন। ভবিষ্যতে চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান ও খনন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সেখানে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে দেশগুলো।
আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর আশপাশের স্থায়ী অন্ধকার অঞ্চলগুলোতে বিপুল পরিমাণ পানির বরফ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব বরফ উত্তোলন করে ভবিষ্যতে নভোচারীদের পানির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন ও রকেটের জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
এ ছাড়া চাঁদের মাটি থেকে অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম ও সিলিকনের মতো খনিজ সংগ্রহের সম্ভাবনাও রয়েছে। এসব উপাদান ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য ও স্যাটেলাইট তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ২০৩০ সালের মধ্যে
চাঁদে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনায় এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
‘লুনার রিঅ্যাক্টর-১’ নামের এ চুল্লি থেকে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ওজন ছয় হাজার কেজির কম হওয়ার কথা। কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই টানা পাঁচ বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়া-চীনের লক্ষ্য ২০৩৬ সাল
অন্যদিকে রাশিয়া চীনের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘সেলেনা’ নামে একটি ছোট পারমাণবিক চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে। এটি ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে এবং প্রায় ১০ বছর রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই সচল থাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চুল্লিটির সম্ভাব্য ওজন ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজি। ২০৩৬ সালের মধ্যে চীনের নেতৃত্বাধীন একটি চন্দ্রঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের উপযোগী করে এটি প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন প্রয়োজন পারমাণবিক বিদ্যুৎ?
চাঁদে সৌরবিদ্যুতের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা কঠিন। কারণ চাঁদের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে প্রায় ১৪ দিন সূর্যের আলো থাকে, এরপর প্রায় ১৪ দিন রাত থাকে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে পৃথিবী থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি কিংবা জ্বালানি নিয়ে যাওয়া ব্যয়বহুল। এ কারণে পারমাণবিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্রাভিযানের জন্য কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা।
রয়েছে দুর্ঘটনা ও তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি
চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিরাপদে পরিবহন ও স্থাপন। পৃথিবী থেকে রকেটে করে চুল্লিগুলো নিয়ে যেতে হবে এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে চাঁদের মাটিতে অবতরণ করাতে হবে।
নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরিকল্পনায় চুল্লিগুলো চাঁদে পৌঁছানোর আগে বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
মহাকাশে পারমাণবিক দুর্ঘটনার ইতিহাসও রয়েছে। ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কসমস-৯৫৪ নামের একটি পারমাণবিকচালিত স্যাটেলাইট কানাডার উত্তরাঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়। এতে বিস্তীর্ণ এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় বড় ধরনের অভিযান চালাতে হয়।
চাঁদের মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা
চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদ বা মহাকাশের কোনো অংশের ওপর সার্বভৌম মালিকানা দাবি করতে পারে না। তবে সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্পদ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনো দেশ চাঁদের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নির্দিষ্ট অঞ্চল ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। এতে অন্য দেশের মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে কার্যত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে চাঁদে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণা, সম্পদ আহরণ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
