চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গায় ব্যতিক্রমী সাজে তৈরি হয়েছে একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপ। জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র, ছাপাখানার প্রতিকৃতি, কাগজের সাইকেল, হকার ও রানারের চিত্রকল্পে সাজানো হয়েছে পুরো মণ্ডপ। এমনকি দেবী দুর্গার শাড়িও তৈরি করা হয়েছে কাগজ দিয়ে। সব মিলিয়ে মণ্ডপটি যেন সংবাদপত্র ও যোগাযোগব্যবস্থার বিবর্তনের এক জীবন্ত জাদুঘর।
পতেঙ্গা হিন্দুপাড়া শ্মশান শিব ও কালী মন্দিরে পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের আয়োজনে এবারের মণ্ডপের থিম ‘যুগান্তরের বার্তাবহন’। এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত মানুষের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার নানা মাধ্যম এবং বার্তাবাহকদের অবদান।
মণ্ডপে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ঝুড়িভর্তি সংবাদপত্র হাতে এক হকার। পাশে রয়েছে কাগজের তৈরি সাইকেল আরোহী। দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কবুতরের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো, ঢোল বাজিয়ে খবর জানানো ঢুলী, ছুটে চলা রানার এবং বাড়ি বাড়ি সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়া হকারের দৃশ্য। এক কোণে রয়েছে ছাপাখানার প্রতিকৃতি।
মণ্ডপের প্রতিমা তৈরি করেছেন সূর্য দাশ। আর এর সৃজনশৈলী ও চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন তন্ময় দাশ ও জুয়েল দত্ত। গত বছর এই মণ্ডপের থিম ছিল ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি’।
ডিজিটাল যুগে সংবাদপত্রের ঐতিহ্য তুলে ধরার উদ্যোগ
পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের কার্যকরী পরিষদের সভাপতি ও শিক্ষক পিকুল দেব জানান, অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারে ছাপা সংবাদপত্রের প্রভাব আগের তুলনায় কমেছে। একসময় সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল ডাকঘর ও রানার। এখন মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই খবর মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
তাঁর ভাষ্য, সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি বদলালেও সংবাদ ও তথ্যের গুরুত্ব কমেনি। তাই দুর্গোৎসবের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংবাদ পরিবহনের ইতিহাস, যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করা বার্তাবাহকদের অবদান তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
পিকুল দেব আরও জানান, এবার মণ্ডপ তৈরিতে মোট ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে সাজসজ্জায় খরচ হয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকা। আয়োজকদের নিজস্ব চাঁদার অর্থে এ ব্যয় নির্বাহ করা হয়েছে।
দর্শনার্থীদের প্রশংসা
চট্টগ্রামের চিত্রশিল্পী দীপক দত্ত মণ্ডপটি পরিদর্শন করে আয়োজনটির প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, কাগজকে সভ্যতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে সংবাদপত্রের ঐতিহ্য এবং হকার ও রানারদের অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগটি ব্যতিক্রমী।
কাটগড় থেকে মণ্ডপ দেখতে আসা ব্যাংকার প্রিয়াংকা চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরলেও এই আয়োজন তাঁর কাছে আলাদা মনে হয়েছে। বিশেষ করে সংবাদপত্রের উপকরণ দিয়ে তৈরি শাড়িতে দেবী দুর্গাকে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন।
ইস্টার্ন রিফাইনারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুনও মণ্ডপে এসে সংবাদপত্র, ছাপাখানা ও সংবাদ পরিবহনের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পেরেছে বলে জানায়।
চিত্রকল্পকার তন্ময় দাশের মতে, সময়ের সঙ্গে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের কাছে সত্য ও তথ্য পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্ব অপরিবর্তিত রয়েছে। সেই ভাবনা থেকেই দেবী দুর্গাকে কাগজের শাড়িতে বার্তাবাহকের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
