গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পণ্য আমদানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাঁরা রমজানের আগে গ্যাস, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং ও আমদানি কার্যক্রমে বিদ্যমান বাধা দূর করে বাজারে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত, সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখা নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় এসব কথা বলেন ব্যবসায়ীরা।

দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্টে দেশে দৈনিক গড় গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসগুলোর মধ্যে এটি ছিল সর্বনিম্ন।

টিকে গ্রুপের ফাইন্যান্স ও অপারেশন পরিচালক শফিউল আথার তাসলিম জানান, গ্যাস সংকটের কারণে তাঁদের দুটি কারখানার একটি গত দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের মতো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

তাঁর আশঙ্কা, এখনই পরিস্থিতির সমাধান না হলে আগামী রমজানে বাজারে পণ্য সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে রমজান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

সিটি গ্রুপের করপোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার বিষয়ে আরও সক্রিয় নজরদারির আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, চিনি, গম ও ডালের মতো পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে। কেন এই পতন হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, অক্টোবর বা নভেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় এলসি খোলা না হলে রমজানের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আমদানি সময়মতো সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে সিটি গ্রুপেরও বেশ কয়েকটি শিল্পকারখানা বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি। এতে ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপণ্য উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপদেষ্টা শফিউর রহমান জানান, সাম্প্রতিক সময়ে খুচরা বাজারে চিনির দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। বাংলাদেশের মোট চিনির চাহিদার প্রায় ৯৯ শতাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বৃদ্ধির পেছনে অপরিশোধিত তেলের দামসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক কারণ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ হোলসেল এডিবল অয়েল ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, কয়েক বছর ধরে নিত্যপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একসময় প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি বড় গ্রুপ এ খাতে সক্রিয় থাকলেও এখন হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাজারে বড় ভূমিকা রাখছে।

তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের গ্যাস, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং ও নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, আমদানি ও উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বাজারের মজুত কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের ঘাটতি তৈরি হবে।

রমজানের কথা বিবেচনায় নিয়ে বড় পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের পাশাপাশি বাজারে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে এরফান গ্রুপের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান জানান, সুগন্ধি চালের দাম গত বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর সুগন্ধি চালের উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেন তিনি। রপ্তানিও দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ বলে জানান তিনি।

সভায় এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক ব্যবসায়ীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে না বাড়ানোর আহ্বান জানান। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও চাল, ডাল ও ভোজ্যতেলের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অযথা বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় দায়িত্বশীলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যবসায়ী সমাজের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version