খাবারের আগে কী খাচ্ছেন, তা রক্তে শর্করার মাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণের আগে অলিভ অয়েল খেলে রক্তে গ্লুকোজের প্রাথমিক বৃদ্ধি কম হতে পারে। তবে গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর চালানো হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী Diabetes-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় অলিভ অয়েল গ্রহণের সময়, পাকস্থলীর কার্যক্রম এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন হরমোনের সম্পর্ক পরীক্ষা করেন গবেষকেরা।
খাবারের আগে অলিভ অয়েল নিয়ে গবেষণা কেন?
খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়া ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগের কিছু মানবদেহভিত্তিক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের আগে শাকসবজি, প্রোটিন বা চর্বিযুক্ত খাবার খেলে খাবার-পরবর্তী রক্তে শর্করার বৃদ্ধি কিছুটা কম হতে পারে।
এ কারণে গবেষকেরা জানতে চেয়েছেন, কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের আগে অলিভ অয়েল খেলে ঠিক কীভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা পরিবর্তিত হয় এবং এ ক্ষেত্রে শরীরের কোন প্রক্রিয়াগুলো কাজ করে।
যেভাবে পরীক্ষা চালানো হয়
গবেষণায় ইঁদুরকে কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়। একদলকে গ্লুকোজ দেওয়ার আগে পানি পান করানো হয়। অন্য একদলকে প্রথমে অলিভ অয়েল দিয়ে ১৫ মিনিট পর গ্লুকোজ দেওয়া হয়। আরেক দলকে গ্লুকোজ দেওয়ার ১৫ মিনিট পর অলিভ অয়েল দেওয়া হয়।
এরপর গবেষকেরা ইঁদুরগুলোর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা, বিভিন্ন হরমোনের কার্যক্রম এবং পাকস্থলী থেকে খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রে যাওয়ার গতি পর্যবেক্ষণ করেন। পাশাপাশি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ইঁদুর এবং হরমোন ও স্নায়ুর কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা ইঁদুরের ওপরও পরীক্ষা চালানো হয়।
অলিভ অয়েল খাওয়ার আগে দিলে কী দেখা গেছে?
গবেষণায় দেখা যায়, গ্লুকোজ গ্রহণের আগে অলিভ অয়েল পাওয়া ইঁদুরগুলোর রক্তে শর্করার প্রাথমিক বৃদ্ধি তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু গ্লুকোজ দেওয়ার পরে অলিভ অয়েল গ্রহণকারী ইঁদুরের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রভাব দেখা যায়নি।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অলিভ অয়েল গ্রহণের ফলে পাকস্থলী থেকে খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রে যাওয়ার গতি ধীর হতে পারে। ফলে গ্লুকোজ তুলনামূলক ধীরে ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ার প্রবণতা কমে।
হরমোন ও স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকা
গবেষণায় গ্লুকাগন, জিআইপি ও জিএলপি-১ নামের কয়েকটি হরমোনের ভূমিকা উঠে এসেছে। এসব হরমোন খাবার গ্রহণের পর শরীরের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
গবেষকদের মতে, গ্লুকাগন ও জিএলপি-১-এর সংকেত এবং ভেগাস স্নায়ুর কার্যক্রম সম্মিলিতভাবে পাকস্থলীর খাবার খালি করার গতি ও রক্তে শর্করার প্রাথমিক বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই ফলাফল খাবার গ্রহণের ক্রম কীভাবে শরীরের হজমপ্রক্রিয়া ও হরমোনের সঙ্গে সম্পর্কিত, সে বিষয়ে নতুন ধারণা দেয়।
মানুষের জন্য এর অর্থ কী?
গবেষণাটি খাবার গ্রহণের ক্রম এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক তুলে ধরেছে। তবে ইঁদুরের ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না। মানুষের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে অলিভ অয়েল একইভাবে রক্তে শর্করার বৃদ্ধি কমায় কি না, তা যাচাই করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু অলিভ অয়েলের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার এবং রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চিকিৎসাপদ্ধতি পরিবর্তন করা উচিত নয়।
সব মিলিয়ে, গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয় যে শুধু কী খাওয়া হচ্ছে তা নয়, খাবার কী ক্রমে গ্রহণ করা হচ্ছে, সেটিও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে অলিভ অয়েলকে ডায়াবেটিসের প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার মতো পর্যাপ্ত মানবদেহভিত্তিক প্রমাণ এখনো নেই।
