যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন হাজার হাজার ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে রাজধানীতে মোতায়েন করলেও একটি বিশেষ অনুসন্ধানে তাদের অপরাধ দমনে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত বছরের আগস্ট থেকে ওয়াশিংটনে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ সামরিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে তারা শহরের প্রায় ৩ হাজার ২০০ স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তার চেয়েও বেশি।

তবে আদালতের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শহরে দায়ের হওয়া মোট ফৌজদারি মামলার মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ ঘটনায় ন্যাশনাল গার্ডের নাম বা সরাসরি সম্পৃক্ততার উল্লেখ রয়েছে।

গুরুতর অপরাধে ভূমিকা সীমিত?

অনুসন্ধান অনুযায়ী, ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা যেসব ঘটনায় সম্পৃক্ত হয়েছেন, তার বেশিরভাগই ছোটখাটো অপরাধ বা সাধারণ বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে ছোটখাটো চুরি, মেট্রোর ভাড়া না দেওয়া এবং বিভিন্ন সাধারণ বিরোধ।

তথ্য অনুযায়ী, ৬২টি ঘটনায় ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা সরাসরি কাউকে গ্রেপ্তার করেছেন। আরও ৪৩টি ঘটনায় তারা পুলিশের অভিযানে সহযোগিতা করেছেন। অন্য ৩৫টি ঘটনায় তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

গত বসন্তের এক রাতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে ন্যাশনাল গার্ডের সীমিত ভূমিকার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ওই ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ ফুটপাতে এক তরুণীকে মারধরের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাস্থলের আশপাশে প্রায় ১৫ জন ন্যাশনাল গার্ড সদস্য টহলে থাকলেও তারা হামলা থামাতে এগিয়ে আসেননি।

বিপুল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের আর্থিক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মোতায়েন কার্যক্রমে মার্কিন প্রশাসনের দৈনিক ব্যয় প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার বলে দাবি করা হয়েছে। এটি ওয়াশিংটন শহরের দৈনিক পুলিশ বাজেটের চেয়েও বেশি।

এ ছাড়া ২০২৯ সাল পর্যন্ত মোতায়েন অব্যাহত রাখতে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাগরিকদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া

রাজধানীর সাধারণ নাগরিক ও স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের অনেকেই ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, নিরাপত্তা বাড়ানোর পরিবর্তে রাস্তায় সশস্ত্র সামরিক সদস্যদের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে।

অন্যদিকে, সামরিক সদস্যদের আইনি ও কার্যগত সীমাবদ্ধতার কারণে বড় ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে তাদের মূলত স্থানীয় পুলিশকে খবর দেওয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা শুধু উপস্থিতি জানান দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে সমালোচকদের দাবি।

নিরাপদ এলাকায় বেশি টহল?

ওয়াশিংটনের অপরাধ পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের ৮২ শতাংশ হত্যাকাণ্ড অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে ঘটে। অথচ গত এক বছরে এসব এলাকায় ন্যাশনাল গার্ডের আইনগত কার্যক্রমের উল্লেখ খুব কম পাওয়া গেছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, এর পরিবর্তে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, সচ্ছল ও শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বেশি টহল দিতে দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা

অবসরপ্রাপ্ত ন্যাশনাল গার্ড জেনারেল র‍্যান্ডি ম্যানারসহ কয়েকজন সামরিক বিশেষজ্ঞ এই মোতায়েনের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সশস্ত্র সামরিক সদস্যদের রাস্তায় নামানো কার্যকর সমাধান নয়।

ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য দাবি করছে, ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের ফলে রাজধানীতে অপরাধ কমেছে এবং শহরের পরিবেশ ও সৌন্দর্য উন্নত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় গাড়ি চুরির মতো কিছু অপরাধ কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও সামগ্রিক সহিংস অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য প্রভাব নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।

ফলে ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন অব্যাহত রাখা হবে কি না এবং অপরাধ দমনে এর প্রকৃত কার্যকারিতা কতটা—তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও জনপরিসরে বিতর্ক আরও জোরালো হচ্ছে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version