দেশে আবারও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে এলপিজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশে আমদানিও কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। অনেক জায়গায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ২ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বিশ্ববাজারের সংকটে কমেছে সরবরাহ
এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর এলাকায় পরিস্থিতির কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি জাহাজ চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে এলপিজির ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, যেসব প্রতিষ্ঠানের এলপিজি আমদানির চুক্তি রয়েছে, তারাও আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম সরবরাহ পাচ্ছে। পাশাপাশি খোলাবাজারেও সরবরাহ কমে গেছে।
দেশে কত এলপিজি আমদানি হয়েছে
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। ওই মাসে ১৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করেছিল। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার টন, আর এ মাসে নিয়মিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে ৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি ব্যবসার জন্য ৫২টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পেয়েছে। এর মধ্যে ৩২টির নিজস্ব সিলিন্ডার ভর্তি করার প্ল্যান্ট রয়েছে। ২৩টি প্রতিষ্ঠানের আমদানির সক্ষমতা থাকলেও নিয়মিত এলপিজি আমদানি করে মাত্র ৮ থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠান।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম
দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ এলপিজি ব্যবহার করেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। পরিবহন ও শিল্প খাতেও এলপিজির ব্যবহার রয়েছে।
বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে অনেক ভোক্তাকে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে।
রাজধানীর একজন ভোক্তা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে একই ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ১০০ টাকা হয়েছে।
সরকারি আমদানির উদ্যোগেও অনিশ্চয়তা
এলপিজি বাজারের বড় অংশ বেসরকারি খাতের হাতে। বাজারের মাত্র প্রায় ১ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত ডিসেম্বরে সংকট দেখা দেওয়ার পর সরকার সরাসরি এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয়। তবে কয়েক দফা সরবরাহকারী খোঁজার পরও শুরুতে কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি।
পরে একটি প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার টন এলপিজি সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করলে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কাজ দেওয়া হয়। তবে আমদানি করা সেই এলপিজি ঠিক কবে দেশে পৌঁছাবে, তা নিশ্চিত নয়।
সামনে আরও বাড়তে পারে চাপ
এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সংকট আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের কেউ কেউ অতিরিক্ত দামের অভিযোগে বাজারে অভিযান হওয়ার আশঙ্কায় দোকান বন্ধ রাখছেন। এতে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে বাজারে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমদানি চললেও ভবিষ্যতে আমদানি অব্যাহত রাখা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, আমদানি কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশের এলপিজি বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ও দেশের আমদানি পরিস্থিতির ওপর।

