বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আসন সমঝোতা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিয়ে দুই দলের মতপার্থক্য বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এনসিপির জোট ছাড়ার গুঞ্জনও জোরালো হয়েছে। তবে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি দলটি।
দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ২১ অক্টোবর এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতা করে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি জোটের যৌথ কর্মসূচি কমিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। ঢাকা দক্ষিণে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তরে সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী করা হয়েছে।
লংমার্চে নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতি নিয়ে আলোচনা
গত ৩১ অক্টোবর ১১ দলীয় জোটের সাত দফা দাবিতে ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচির উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের জন্য একটি চেয়ার রাখা হলেও তিনি উপস্থিত হননি। তাঁর পরিবর্তে কর্মসূচিতে অংশ নেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব সারজিস আলম। তবে উদ্বোধনী সমাবেশে তাঁদের কেউ বক্তব্য দেননি।
এর আগের দুটি লংমার্চে নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেলেও এবার শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি করেছে।
এনসিপির এক নেতার দাবি, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে দলের প্রার্থীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকায় লংমার্চে যোগ দিতে পারেননি নাহিদ ইসলাম।
তবে দলের আরেক নেতার মতে, এর পেছনে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে মতবিরোধও রয়েছে। বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর জামায়াতের অবস্থান নিয়ে এনসিপির মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সিটি নির্বাচনের আসন সমঝোতা নিয়ে বিরোধ
এনসিপি ও জামায়াতের একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দলের দূরত্বের সূত্রপাত গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে আসন সমঝোতার আলোচনায় এনসিপি অন্তত তিনটি সিটিতে ছাড় চেয়েছিল। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটির অন্তত একটিতে নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে অনড় ছিল দলটি।
অন্যদিকে, ঢাকার কোনো সিটিতেই শরিকদের ছাড় দিতে রাজি ছিল না জামায়াত। বিনিময়ে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সিটিতে এনসিপিকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেয় দলটি। তবে সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি এনসিপি। একপর্যায়ে বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসেন দলটির নেতারা।
এরপর থেকেই দুই দলের সম্পর্কে শিথিলতা তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন। গত এক মাসে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকেও নাহিদ ইসলামের অংশগ্রহণ ছিল না বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ঘিরেও অসন্তোষ
গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়েও দুই দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি এনসিপির কয়েকজন নেতার।
তাঁদের অভিযোগ, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও জামায়াত জোরালো অবস্থান নেয়নি। এ ছাড়া বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে পরাজিত জামায়াত প্রার্থীর হাসিমুখে মিষ্টি খাওয়ার ঘটনাও এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
এ নিয়ে গত ৩০ অক্টোবর শাহবাগে এনসিপির গণবিক্ষোভ কর্মসূচিতেও প্রতিবাদ জানান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ এনসিপির
তবে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি কিংবা ১১ দলীয় জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করেছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।
তিনি বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক খারাপ হওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। দুই দলের মধ্যে কোনো আদর্শিক জোট নেই। নির্বাচনী ঐক্যের ভিত্তিতেই ১১ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে।
মনিরা শারমিনের ভাষ্য, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতেই জোট গঠিত হয়। তাই জোটের কর্মসূচির পাশাপাশি এনসিপি নিজেদের কর্মসূচিও পালন করছে।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আসন সমঝোতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে এনসিপি-জামায়াতের মধ্যে মতপার্থক্য সামনে এসেছে। তবে এসব মতবিরোধের কারণে এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ দলীয় জোট ছাড়ছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।
