ঢাকা, ২৩ আগস্ট ২০২৬: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)নির্ভর অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতায় দক্ষ করে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও সরকারের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গত ১৫ জুলাই গ্রামীণফোন ও দ্য ডেইলি স্টারের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এ বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ উঠে আসে। আলোচনায় নীতিনির্ধারক, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সংস্থা, এডটেক বিশেষজ্ঞ ও তরুণরা অংশ নেন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, এআই ইতোমধ্যে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; তরুণদের এআই ব্যবহারের সক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও বাড়াতে হবে।

উত্তর সাউথ ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. জুলকারিন জাহাঙ্গীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এআই লিটারেসি, গবেষণার নৈতিকতা ও নতুন ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করার পাশাপাশি শিল্পখাতের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে। স্থানীয় ভাষার ডেটাসেট, দায়িত্বশীল এআই নীতি ও গবেষণায় বিনিয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

গ্রামীণফোনের হেড অব এনভায়রনমেন্ট, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স ফারহানা ইসলাম জানান, প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু কর্মসংস্থানের সঙ্গে দক্ষতার অসামঞ্জস্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। তাঁর মতে, এআইকে চাকরি হারানোর কারণ হিসেবে না দেখে উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে দেখতে হবে।

শিখোর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহির চৌধুরী বলেন, শুধু দ্রুত পরিবর্তনশীল এআই টুল শেখানো নয়, তরুণদের মৌলিক শিক্ষা, যোগাযোগ, সমালোচনামূলক চিন্তা ও সৃজনশীলতার ওপরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে সাশ্রয়ী স্মার্টফোন, কম ইন্টারনেট খরচ এবং সবার জন্য ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।

বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি মুনির হাসান বলেন, এআইয়ের যুগে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে প্রশ্ন করা, বিশ্লেষণ ও নতুন কিছু তৈরি করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের মধ্যে কৌতূহল ও স্বাধীনভাবে সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সেরাজ বলেন, শিশু, স্কুলশিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়নের কৌশল এক হতে পারে না। এআই নৈতিকতা, ক্যারিয়ার গাইডেন্স, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাক্রম হালনাগাদের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের ট্রান্সফরমেটিভ ইকোনমিক পলিসি প্রোগ্রামের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মারুফ আজম বলেন, এআই শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক রূপান্তরেরও অংশ। তরুণদের প্রস্তুত করতে ডিজিটাল দক্ষতা, শিল্পখাতের সংযোগ, নীতিগত সহায়তা ও এআই সচেতনতা সমন্বিত একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানউল্লাহ বলেন, উচ্চশিক্ষাকে আরও দক্ষতাভিত্তিক, শিল্পঘনিষ্ঠ ও এআই-উপযোগী করতে হবে। একই সঙ্গে মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি সব বিষয়ে এআই শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।

ইউজিসির চেয়ারম্যান ড. মামুন আহমেদ বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণের অনেকেই চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় বেকার রয়েছেন। এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।

শিক্ষা ও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদি আমিন বলেন, এআইকে হুমকি হিসেবে নয়, দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, এআই লিটারেসি, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে জোর দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৮৭ লাখ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। এআইয়ের কারণে প্রচলিত কিছু কাজের ধরন বদলে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য এখন থেকেই দক্ষতা উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আলোচনায় অংশ নেওয়া তরুণরাও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ, শিল্পখাতের মেন্টরশিপ, এআইভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী এবং চাকরির বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইনির্ভর অর্থনীতিতে বাংলাদেশের বড় শক্তি দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করতে পারলে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়বে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version