যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের প্রভাবে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে ইরান। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া ও কর্মসংস্থানের সংকটে খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন দেশটির সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভাঙছে, ঋণ করছে কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানে ভোক্তাপণ্যের দাম প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। বার্ষিক মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশে। একই সময়ে খাদ্য ও পানীয়ের দাম বেড়েছে ১২১ দশমিক ৮ শতাংশ। এতে পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাবার কেনার পেছনে ব্যয় হচ্ছে, কমাতে হচ্ছে অন্যান্য খাতের খরচ।
ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ৪৭ বছর বয়সী দোকানি মোহাম্মদ আলি রয়টার্সকে বলেন, তাঁদের হাতে টাকা নেই, ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়তা নেই, এমনকি আশাও নেই। আবার যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে—এই ভয় এবং মাস শেষে সংসারের খরচ চালাতে না পারার দুশ্চিন্তা নিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের।
আয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি জীবনযাত্রার ব্যয়
ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছেন পেনশনভোগী, শ্রমিক ও সরকারি কর্মচারীরা।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, তিন সদস্যের একটি শ্রমজীবী পরিবারের মাসিক ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় প্রায় ৩৩৬ ডলার। অথচ মুক্তবাজারের বিনিময় হার অনুযায়ী দেশটিতে গড় মাসিক মজুরি প্রায় ৯২ ডলার। অর্থাৎ, একটি পরিবারের ন্যূনতম ব্যয়ের তুলনায় গড় আয় অনেক কম।
এদিকে সেপ্টেম্বরে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। আবাসন, পরিষেবা ও জ্বালানির ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। ফলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাসাভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকট
ইরানে চাকরির বাজারেও বাড়ছে চাপ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বসন্তকালে দেশটির বেকারত্বের হার বেড়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেকার।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমাতে নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখছে। অন্যদিকে, ক্রেতাদের ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যবসার আয়েও চাপ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান চাকরিও ঝুঁকিতে পড়ছে।
যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের তেল রপ্তানি, বাণিজ্য ও সরকারি রাজস্বে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বন্ধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার প্রভাব। গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রম ঘোষণা করে। ওয়াশিংটনের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ইরানের আর্থিক লেনদেন ও রাজস্বের উৎসগুলোকে আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
এসব পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয় ও কাঁচামাল সংগ্রহের খরচ বেড়েছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সংকটে পড়েছে।
বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্নেও বাধা
ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মূল্য গত এক বছরে অর্ধেকেরও বেশি কমে যাওয়ায় বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
২৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার তুরস্কে দুই বছর চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার পর টিউশন ফি দিতে না পেরে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী বৈদেশিক মুদ্রার উচ্চমূল্য ও আয় কমে যাওয়ার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়ছেন।
অর্থনৈতিক সংকটে বাড়ছে জনঅসন্তোষ
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব ইরানের সরকারের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এর আগে দেশটিতে মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে একাধিকবার বিক্ষোভ হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে গেলে জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তবে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

