আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গে প্রাচীন গ্রিস ও পারস্যের যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তাঁর বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছে তেহরান। ইরানের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অতীতের ইতিহাসকে নির্বাচিতভাবে উপস্থাপন করে বর্তমানের সামরিক পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
গত ৭ অক্টোবর গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে ঐতিহাসিক পনিক্স এলাকায় দেওয়া এক ভাষণে রুবিও পশ্চিমা সভ্যতার শক্তি, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। তিনি প্রাচীন গ্রিস ও রোমের ইতিহাসের উদাহরণ টেনে পশ্চিমা দেশগুলোকে জাতীয় স্বার্থ, সামরিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর আহ্বান জানান।
গ্রিস-পারস্যের যুদ্ধের উদাহরণ দিলেন রুবিও
ভাষণে রুবিও খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮০ সালে পারস্যের রাজা প্রথম জার্কসিসের বাহিনীর এথেন্স আক্রমণের ঘটনা তুলে ধরেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, পারস্যের বাহিনী এথেন্সের উপাসনালয় লুট করে এবং অ্যাক্রোপলিসে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পরে এথেন্সের মানুষ ফিরে এসে পেরিক্লিসের শাসনামলে পার্থেনন নির্মাণ করেন।
রুবিও এই ইতিহাসকে বহিঃশত্রুর মোকাবিলা করে পশ্চিমা সভ্যতার টিকে থাকার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ইরানের শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে শহীদ হওয়ার ধারণাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
রুবিও বলেন, বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলো যেসব হুমকির মুখে রয়েছে, সেগুলো প্রাচীনকালের সংঘাতের মতোই বাস্তব। তাঁর বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জাতীয় শক্তি বৃদ্ধির নীতির প্রতিফলনও দেখা যায়। <Cite refs={[“turn448306news31″,”turn448306search0”]}/>
‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে’
রুবিওর বক্তব্যের জবাবে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত শীর্ষ কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি প্রাচীন পারস্যের আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা সামনে আনেন। তিনি ২৬০ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের সাসানীয় সম্রাট প্রথম শাপুরের বাহিনীর হাতে রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানের বন্দি হওয়ার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেন।
রেজায়ির বক্তব্যের সারকথা, ইতিহাসের একটি অংশ তুলে ধরে সভ্যতার সংঘাতের বয়ান তৈরি করলে ইতিহাসের অন্য অধ্যায়গুলোকেও মনে রাখতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যাঁরা ইতিহাস সামনে আনবেন, তাঁদের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও রুবিওর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে বিদেশি শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের ঐতিহাসিক প্রতিরোধের বিষয়টি উঠে আসে।
ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তেহরানের
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেছেন, রুবিও গ্রিক, রোমান, খ্রিষ্টীয় ও আধুনিক ইতিহাসকে নিজের রাজনৈতিক বক্তব্যের পক্ষে সরলভাবে উপস্থাপন করেছেন।
বাঘাইয়ের মতে, ইতিহাসের নির্বাচিত অংশ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের শক্তি প্রয়োগের নীতিকে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করছে। তেহরানের অবস্থান হলো, প্রাচীন সভ্যতার সংঘাতকে বর্তমান সময়ের সামরিক কর্মকাণ্ডের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
ইরানের সংস্কৃতিমন্ত্রী রেজা সালেহি-আমিরিও পশ্চিমা রাজনীতিকদের দেশটির বিষয়ে সম্মানজনক ভাষা ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইরানকে হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি জীবন্ত সভ্যতা ও মহান জাতি হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি দেশের পরিচয়কে কোনো এক যুদ্ধ, শাসক বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাড়ছে উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারির সামরিক হামলার পর থেকে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ১১ অক্টোবরও ওমান উপসাগরে ইরানের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি বাণিজ্যিক জাহাজ অচল করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
এমন পরিস্থিতিতে রুবিওর বক্তব্যকে শুধু প্রাচীন ইতিহাসের আলোচনা হিসেবে দেখছে না তেহরান। ইরানের কর্মকর্তারা মনে করছেন, পশ্চিমা সভ্যতা রক্ষার ভাষ্য ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক নীতির পক্ষে সমর্থন বাড়াতে চাইছে।
অন্যদিকে, রুবিওর ভাষণে পশ্চিমা দেশগুলোর ঐতিহাসিক পরিচয়, জাতীয় স্বার্থ ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রাচীন গ্রিস ও পারস্যের সংঘাতের ইতিহাস বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন করে উঠে এসেছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন।
