ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ইসরাইল। দেশটির সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক—উভয় ধরনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত ইরানে আবার হামলা চালানো হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি জোরদার করছে ইসরাইল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজনৈতিক সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ইরানের সঙ্গে আরেক দফা সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে পরিস্থিতি। তবে নতুন করে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের একক নিয়ন্ত্রণ নেই। তেহরানের সঙ্গে চুক্তির পথে এগোবেন, নাকি ইসরাইলের সঙ্গে সমন্বয় করে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করবেন—তা নির্ধারণ করবেন ট্রাম্প।
হামলার প্রস্তুতিতে ইসরাইলি বিমানবাহিনী
ইসরাইলের সামরিক প্রস্তুতি এখন আর শুধু পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির বিমানবাহিনী কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ নিয়ে সিরিয়া ও ইরাকের আকাশসীমায় একাধিকবার মহড়া চালিয়েছে।
এসব মহড়ায় ইরানের সীমান্তমুখী সম্ভাব্য হামলার পথও অনুশীলন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযানের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি প্রদর্শন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান পরিচালনার বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরেছেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন।
তবে নতুন করে হামলা শুরুর বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি সামরিক কার্গো বিমান ইসরাইলের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে। এসব বিমানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে।
সামরিক অভিযানের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন
সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে সুস্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্যের অভাবকে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সূত্রগুলোর মতে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতায় বিমান হামলা চালালেই দেশটির সরকার পতন হবে কিংবা নীতিতে পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ কারণে সামরিক হামলার হুমকিকে ইরানকে আলোচনার টেবিলে এনে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে চুক্তিতে রাজি করানোর কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে ওয়াশিংটন।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ইসরাইলের উদ্বেগ দূর না করে কোনো চুক্তি হলে দেশটির নিরাপত্তাসংক্রান্ত আশঙ্কা থেকেই যাবে বলে মনে করছে ইসরায়েলি সূত্রগুলো।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে লেবাননেও
ইরানে নতুন করে হামলা শুরু হলে সংঘাত লেবাননেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগের সংঘাতে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যুক্ত হয়েছিল। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তারাও আবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
এতে ইসরাইলকে একই সময়ে একাধিক фронটে যুদ্ধের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তৈরি হলে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মজুতের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
ইসরায়েলি সূত্রগুলোর আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দিনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করলেও ইরান ও হিজবুল্লাহ সংঘাত দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করতে পারে।
কাতারের মধ্যস্থতায় চলছে আলোচনা
সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। এসব আলোচনার লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ তৈরি করা।
সম্ভাব্য আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক প্রণোদনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। কোনো চুক্তি হলে চীন ও রাশিয়া এর নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও ইসরায়েলি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ৩১ অক্টোবর কাতারের রাজধানী দোহায় ইরানি প্রতিনিধিরা মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর আগে তেহরানেও কাতারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনো নতুন করে হামলার সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিতে চান। তবে প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
নতুন যুদ্ধ নাকি কূটনৈতিক সমাধান?
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয়। পরে এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও আলোচনা ভেঙে পড়ার পর জুলাইয়ে আবারও সংঘাত শুরু হয়।
বর্তমানে ইসরাইল নতুন সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে দাবি করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা এখনো চলছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোবে, নাকি ইসরাইলের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করবে, সেটিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
